
বোচাগঞ্জ প্রতিনিধি
এই তো কিছুদিন আগের কথা। আখ মাড়াই মৌসুম এলেই কয়েক ঘন্টা পর পর মিলের সাইরেন বেজে উঠার শব্দ, বড় বড় গাড়ির লাইন, ট্রাক, ট্রাক্টর, নছিমন কিংবা গরুর গাড়িতে করে সারি সারি আখ ভর্তি গাড়ি মিলের গেটে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো। কৃষকের আখ কর্তনে ব্যস্ততা। মিলের কর্মকর্তা কর্মচারীদের পদচারণায় ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করা চিরাচরিত এই দৃশ্যটি গত কয়েক বছর ধরে আর চোখে পড়ে না। চিনিকলের ভিতরে গেলে মিলের বর্তমান দৃশ্য দেখে মনটা মলিন হয়ে যায় অনেকেরই। কর্মচঞ্চলতা না থাকায় এক সময়ের ব্যস্ত মিলরোডের সড়কটি এখন শুনশান সড়কে পরিনত হয়েছে। এক সময়ে মিলের কলোনীতে ঘুরতে যাওয়া মানুষরা এখন সেই রাস্তাটিও ভুলে গেছে। সেখানেও নেই কোন কর্মচঞ্চলতা। বাংলাদেশের যতগুলো চিনিকল রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক ও সর্বোচ্চ জমির পরিমান রয়েছে সেতাবগঞ্জ চিনিকলের । আবাদি জমি সহ প্রায় ৩৮শত একর জমি থাকার পরও কোন অদৃশ্য কারনে ২০২০ সালে মিলটির আখ মাড়াই বন্ধ ঘোষনা করে তৎকালীন সরকার। দেশের ১৫টি চিনিকলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত করতে ব্যর্থ হওয়া তৎকালীন সরকার একই সাথে ৬টি চিনিকল বন্ধ ঘোষনা করে। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, সেই ৬টি চিনিকলের মধ্যে সেতাবগঞ্জ চিনিকলের নাম থাকায় অনেকেই হতবাক হয়েছেন। এখনো কেউ বিশ^াস করতে পারছেনা যে, কি কারন দেখিয়ে এই ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা হয়েছিল। যে ৬টি চিনিকল বন্ধ করা হয়েছিল তার মধ্যে সেতাবগঞ্জ চিনিকলের লোকসান ছিল অনেক কম। পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সর্বোচ্চ আবাদি জমি থাকার পরও এই হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বন্ধ ৬টি চিনিকল বাদ দিয়ে বাকী যে সব চিনিকল চালু ছিল তার মধ্যে অধিকাংশই চিনিকলের লোকসান, কারখানার ভঙ্গুর অবস্থা সহ আবাদি জমির পরিমান নির্নয় করলে সেক্ষেত্রে সেতাবগঞ্জ চিনিকল অনেক এগিয়ে।
গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার গণঅর্ভূথানের পর বন্ধ সেতাবগঞ্জ চিনিকল চালুর দাবী সোচ্চার হয়েছেন ছাত্র-জনতা সহ শ্রমিক কর্মচারীরা। বিভিন্ন সময়ে অবস্থান কর্মসূচী, গণস্বাক্ষর, বিক্ষোভ মিছিল, গণ মানববন্ধন কর্মসূচী এমনকি ঢাকায় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য খাদ্য কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। ছাত্র-জনতা, শ্রমিক-কর্মচারী, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন মিলটি চালুর দাবী জানিয়ে আসছে। এরই মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছেন বতর্মান বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ড. লিপিকা ভদ্রের সেতাবগঞ্জ চিনিকল পরিদর্শনের মধ্যদিয়ে। গত ৬ অক্টোবর তিনি সেতাবগঞ্জ চিনিকল পরিদর্শনে আসলে চিনিকল অতিথি ভবনে মিলের কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, আখচাষী নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র সমাজের নেতৃবৃন্দের সাথে মত বিনিময় করেন। এছাড়াও তিনি চিনিকলের কারখানা ঘুরে দেখেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, সেতাবগঞ্জ চিনিকল একটি বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান। এই মিলটির কারখানা আধুনিক মানের ও নিজস্ব অনেক জমি থাকার পরও কি কারনে মিলটিকে বন্ধ করা হয়েছিল তা প্রশ্ন থেকে যায়। তবে তিনি আশ^স্ত করে বলেন, আমি চেষ্টা করবো বন্ধ ৬টি মিলের মধ্যে সেতাবগঞ্জ চিনিকলটি এক নম্বরে রেখে দ্রুত সময়ের মধ্যে আখ মাড়াই চালু করা যায় সেই ব্যবস্থা করার। তার এই কথায় দিনাজপুর তথা বোচাগঞ্জের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে তাদের প্রাণের দাবী দিনাজপুর জেলার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান সেতাবগঞ্জ চিনিকলটির চাকা হয়তো এবার সচল হবে।