
নীলফামারী প্রতিনিধি
কৃষি অর্থনীতিনির্ভর উত্তরের জেলা নীলফামারী। জেলার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন কৃষি। এ জেলার উর্বর দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে বিভিন্ন রকম ফসল আবাদ হয়ে থাকে। তবে স্বল্প খরচে অধিক লাভজনক হওয়ায় গ্রামীণ কৃষিতে পতিত জমিতে আগ্রহ বাড়ছে বস্তায় আদা চাষ। এ বছর জেলায় প্রায় ৩ লক্ষাধিক বস্তায় আদা চাষ হচ্ছে। প্রথমবার বস্তার এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাফল্যের স্বপ্ন আব্দুল মান্নান। তার পার্শববর্তী এক চাচার গাছতলায় আদা চাষ করা দেখে আদার বীজ সংগ্রহ করে বস্তায় আদা চাষ শুরু করেন সদর উপজেলার টুপামারী ইউনিয়নের সরকার পাড়া এলাকার কৃষক আব্দুল মান্নান। বস্তায় আদা চাষি আব্দুল মান্নান বলেন,গত বছর আমার এক চাচা এই ভাবে আদা চাষ করতো। তার দেখেই আমার কিছু পতিত জায়গায় এবার আমি ৯ হাজার বস্তায় আদা চাষ করেছি। সামনের বছর ৩০ থেকে ৫০ হাজার বস্তায় আদা চাষের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার প্রতিটা বস্তায় এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। এর মধ্যে আদার পিলাইটা আমি তুলে নিয়েছি যার কারনে এখান থেকে ১৫ টাকা মাইনাস হয়েছে। এখন শুধু আমার কীটনাশক স্প্রের খরচটা আছে। কৃষি কর্মকর্তা সহযোগিতা করেন কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,কৃষি কর্মকর্তা আমাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেন। প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ বারও আমার এখানে আসে দেখা শোনার জন্য। তারা জরিপ করে আমার এখানে কোন সমস্যা আছে কিনা তা দেখে সেটার সমাধান দিয়ে যান। এখানে যিনি মাঠ কর্মী আছে তিনি বরাবরই আসেন আদার কোন প্রবলেম দেখা দিলে উনি সঠিক ট্রিটমেন্ট দিয়ে চলে যান। একই ইউনিয়নের চৌধুরী পাড়া এলাকার আদা চাষি মো. গোলাম উমর ফারুক চৌধুরী বলেন,ইউটিউব দেখে এবারই প্রথম বস্তায় আদা চাষ করেছি। এর আগে আমার বাবা ও বড় ভাই প্রতি বছর পাঁচ বিঘা জায়গায় মাটিতে আদা চাষ করত। আমিও সর্বশেষ ২০১৮ সালে মাটিতে আদা চাষ করেছিলাম, তখন অতিরিক্ত বৃষ্টির পানিতে সব আদা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এবার ইউটিউবে বস্তুায় আদা চাষ দেখার পরে আমিও ১১ হাজার বস্তায় আদা চাষের জন্য বীজ সংগ্রহ করেছিলাম। পরে বস্তা ও মাটি না পাওয়ায় একটি বস্তাতেই দুটি বীজ দিয়ে ৫ হাজার বস্তায় আদা চাষ করেছি। তিনি আরও বলেন,বস্তায় আদা চাষ করে আমি সন্তুষ্ট। বস্তায় আদা চাষ করলে অধিক লাভজনক। আগামীতে আমি ২০ হাজার বস্তায় আদা চাষের জন্য পরিকল্পনা করেছি। আমার এই আদা চাষ দেখে আশেপাশের চাষিরাও বস্তায় আদা চাষের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলায় ৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৭৫টি বস্তায় ও ১৫১ হেক্টর মাটিতে আদা চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে নীলফামারী সদর উপজেলাতেই ১ লাখ ৫ হাজার বস্তায় আদা চাষ করা হচ্ছে। এছাড়াও ডোমারে ৬৫ হাজার, ডিমলায় ৬০ হাজার, কিশোরগঞ্জে ৫৮ হাজার ৪০০টি, জলঢাকায় ২৬ হাজার ও সৈয়দপুর উপজেলায় ১৮ হাজার ১৫০টি বস্তায় আদা চাষ করা হয়েছে। সফলতা পেলে ভবিষ্যতে এভাবে আদার চাষের পরিধি বাড়বে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. এস. এম. আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন,জেলায় ৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৭৫ বস্তায় আদা চাষ হয়েছে। জেলার সবগুলো উপজেলায় বর্তমানে কম-বেশি বস্তায় আদা চাষ হচ্ছে। বস্তায় আদা চাষের জন্য আলাদা করে জমির দরকার নেই। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে কৃষক সহজেই লাভবান হওয়ার সুযোগ পান। বসতবাড়ি ও অন্য ফসলের সঙ্গে ও বিভিন্ন বাগানে সাথি ফসল হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বস্তায় আদা চাষের এই পদ্ধতি। বস্তায় আদা চাষ করলে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কৃষক বাড়তি আয়ও করতে পারবে।