
দিনাজপুর প্রতিনিধি
দিনাজপুরে নকলনবিশদের ৩৮ দিনের কর্মবিরতিতে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে চলমান এ কর্মসূচি জেলার ১৩টি সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কার্যক্রম প্রায় অচল করে দিয়েছে। জমি নিবন্ধন, দলিলের নকলসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ থাকায় মানুষ নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
সদরের দাইনুর গ্রামের বাসিন্দা সাদেক আলী বিগত ২৫ দিন ধরে জমির দলিলের নকল পেতে জেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে প্রতিদিন ধরনা দিচ্ছেন। তিনি জানান, প্রতিদিন ১৮ কিলোমিটার দূর থেকে এসে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। একই ধরনের ভোগান্তিতে রয়েছেন জেলার চিরিরবন্দর, বিরলসহ অন্যান্য উপজেলার বাসিন্দারা। তাদের কেউ জমি সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য দলিলের নকল পাচ্ছেন না, আবার কেউ জমি কেনাবেচার কাজ আটকে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন।
নকলনবিশদের দাবিগুলোর সর্ম্পকে জানা যায়, বাংলাদেশ এক্সট্রা মোহরার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, দিনাজপুরসহ সারা দেশে ১৬ হাজার ২৪৬ জন নকলনবিশ চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন করছেন। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী নিয়োগ বা সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। একজন নকলনবিশ একটি নকল লিখে মাত্র ২৪ টাকা পান, যা তাদের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নয়। আন্দোলনকারীরা সরকারের কাছে তাদের দাবি পূরণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদের কাজ সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এদিকে সাধারণ মানুষের জন্য দলিলের নকল বা নতুন দলিল নিবন্ধন একটি অত্যাবশ্যকীয় সেবা। নকলনবিশদের আন্দোলনের কারণে এ সেবা বন্ধ থাকায় মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকেই আদালতের মামলার জন্য দলিলের নকল পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা তাদের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, নকলনবিশদের আন্দোলন ও জনগণের ভোগান্তি সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নকলনবিশরা তাদের দাবি পূরণে অনড় অবস্থানে থাকলেও জনগণের স্বার্থে এ সমস্যার সমাধানে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সেবা সচল রাখতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।
কর্মবিরতি ও মানুষের ভোগান্তির সমাধান কী জানতে চাইলে বাংলাদেশ এক্সট্রা মোহরার অ্যাসোসিয়েশনের (নকলনবিশ) দিনাজপুর সদর শাখার সহসভাপতি মিনহাজুল আবেদিন বলেন, ‘আমরা ৩৮ দিন ধরে পড়ে আছি। কেউ খোঁজ নিচ্ছে না। চাকরি স্থায়ীকরণ কিংবা জাতীয়করণের কোনও আশ্বাস পাচ্ছি না। গত তিন দিন ধরে আমরা আমরণ অনশন করছি। আমাদের খুব সামান্য টাকা দেওয়া হয়, যা দিয়ে আমরা চলতে পারি না। মাসে ছয়-সাত হাজার টাকা উপার্জন করি। বর্তমান সময়ে এই টাকা দিয়ে কীভাবে সংসার চলে। চাকরি স্থায়ী না করলে অন্তত আমাদের কাজের মাধ্যমে যে অর্থ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে সরকার নিচ্ছে, সেই অর্থ পুরোপুরি আমাদের দেওয়া হলে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবো। এতে কারও ক্ষতি হবে না।’
সংগঠনের সহসভাপতি মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কেন্দ্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমরা কর্মসূচি পালন করছি। আমরা সরকারি কাজ করি। বালাম লেখার মাধ্যমে স্থায়ী রেকর্ডের সৃষ্টি করি। এটির মাধ্যমে সরকারের স্থায়ী রেকর্ড সৃষ্টি হয়, রয়্যালটি উপার্জন হয় সরকারের। নকলনবিশ একসময়ে মারা যাবে। কিন্তু এই রেকর্ড অক্ষয় থাকবে। ততদিন পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আয় চলতেই থাকবে। এই নকলের কাজকে আরও অগ্রগতি করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা করতে আমাদের স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের কাছে আবেদন, আমাদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
অ্যাসোসিয়েশনের সদর শাখার সভাপতি রনজিৎ কুমার রায় বলেন, ‘আমাদের দাবি-দাওয়া পূরণ করা হবে, স্কেলভুক্ত করা হবে। এই আশ্বাসে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর সমাধান হয়নি। ফলে আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। ৩৮ দিন চলছে। এখনও কোনও আশ্বাস পাইনি আমরা।’
দিনাজপুর জেলার রেজিস্ট্রার সাজেদুল হক জানান নকলনবিশরা কর্মবিরতি পালন করায় ৩৮ দিন ধরে নতুন দলিল নিবন্ধনসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘নকলনবিশদের কর্মবিরতির কারণে মানুষের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাদের কারণে আমরাও কাজ করতে পারছি না। সেবা গ্রহীতাদের নকল সরবরাহ করতে পারছি না। আপাতত সাধারণ মানুষকে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই। তবে আদালত থেকে আমাদেরকে কাছে যে বালামগুলো তলব করছেন, ইনডেক্স বই চাইছেন, আমরা সেগুলো দিচ্ছি। নকলনবিশদের কর্মবিরতির কথা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন। তাদের কিছু করতে হবে।’