
পঞ্চগড় প্রতিনিধি
দেবীগঞ্জে জমে উঠেছে কোটি টাকার জলপাইয়ের হাট, কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত। দেশীয় বাজার ছাড়িয়ে বিদেশেও যাচ্ছে পঞ্চগড়ের জলপাই। অনলাইনের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় জলপাই রপ্তানি করে আলোচনায় এসেছে দেবীগঞ্জের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এতে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দেবীগঞ্জের দেবদারুতলার হাটে শুরু হয় জলপাই বেচাকেনা। ভ্যান, রিকশা, মোটরসাইকেল ও পিকআপভর্তি বস্তাবোঝাই জলপাই আসে বাজারে। মাটিতে বিছানো পলিথিনে জলপাই ঢেলে তৈরি হয় স্তূপ, সেখান থেকেই ক্রেতারা বস্তায় ভরে নিয়ে যান নিজেদের গন্তব্যে।
অক্টোবরের শুরু থেকেই জমে উঠেছে এই মৌসুমি হাট। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন এখানে অন্তত ১০০ মেট্রিক টন জলপাই বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা।
জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জলপাই নিয়ে আসেন বাজারে। রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর থেকে পাইকাররা জলপাই কিনে নিচ্ছেন। মানভেদে কেজিপ্রতি দাম ২৫ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবু আনছার বলেন, “আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষকের গাছের জলপাই কিনে আনি। এতে কৃষকের ঝামেলা কমে, আর আমাদেরও ভালো আয় হয়। এখন দাম ভালো, তাই লাভও হচ্ছে।”
নওগাঁ থেকে জলপাই কিনতে আসা পাইকার বকুল হোসেন বলেন, “দেবীগঞ্জের জলপাইয়ের মান অনেক ভালো। তাই প্রতিবছরই এখানে আসি। এবারের মৌসুমে কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৪৫ টাকায় জলপাই কিনেছি। এসব জলপাই আমরা খাদ্যপণ্য তৈরির কারখানায় পাঠাই—কখনো ট্রাকে, কখনো ট্রেনে।”
জলপাইয়ের মৌসুম শুরু হয় অক্টোবর মাসে, চলে নভেম্বর পর্যন্ত। মৌসুমের আগেই ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গাছের ফল চুক্তিতে কিনে রাখেন। ফলে কৃষকের পরিশ্রম কমে, বিক্রেতারাও পান ভালো দাম।
ইজারাদার কাদেরী কিবরিয়া রানা জানান, “এটি ঐতিহ্যবাহী জলপাইয়ের হাট। বাতাবি লেবু, লেবু, পানসহ নানা ফল বিক্রি হয়, তবে জলপাই বিক্রিই সবচেয়ে বেশি। আশপাশের কয়েক জেলার জলপাই বিক্রি হয় এখানেই। এতে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।”
এ বছর দেবীগঞ্জের জলপাই বিদেশেও যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী মুকুল ইসলাম বলেন, “এখানকার জলপাইয়ের গুণগত মান অনেক ভালো। তাই বিদেশে এর চাহিদা বেড়েছে। অনলাইনের মাধ্যমে আমরা মালয়েশিয়ায় জলপাই পাঠাচ্ছি। সরকার সহযোগিতা করলে আরও বড় পরিসরে রপ্তানি সম্ভব।”
পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বড় বাণিজ্যিক বাগান না থাকলেও জেলায় ছোট খামার, বাড়ির উঠান, রাস্তার ধারে ও জমির আলে জলপাই চাষ হচ্ছে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ হেক্টর জমিতে। গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৩০৯ মেট্রিক টন, এবারে তা আরও বাড়বে বলে আশা করছে বিভাগটি।
অল্প পরিচর্যায় ভালো ফলন পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে জলপাই চাষে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, দেবীগঞ্জের জলপাই বাজার এখন জেলার অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। মৌসুম শেষে এখানকার জলপাই চলে যায় দেশের বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কারখানায়—তৈরি হয় আচার, সস ও নানা পণ্য।