রবিবার, ৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পঞ্চগড়ে দুই বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ

পঞ্চগড় প্রতিনিধি
পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল এলাকায় অবস্থিত দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—জগদল দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও জগদল নুর আক্তার সরকার দ্বিমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষার্থীদের নিয়েই আলাদা কোচিং বা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। এতে বিদ্যালয় দুটি ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের রূপ নিচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
সরকার কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে পঞ্চগড়ের কিছু বিদ্যালয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, কিছু অসাধু শিক্ষকের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষই এখন কোচিং সেন্টারে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে জগদল এলাকার ওই দুটি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষকদের মাধ্যমে কোচিং বা প্রাইভেট কার্যক্রম চলছে। প্রতিটি কক্ষে একজন শিক্ষক ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে দিয়ে তারা এসব প্রাইভেট ক্লাসে অংশ নিচ্ছে। তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেরাই এসব ক্লাস নিচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ক্লাস শেষে কিংবা ছুটির দিনেও শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোচিং কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এতে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে কোচিংয়ের ওপর এক ধরনের বাধ্যতামূলক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। অভিভাবকদের আশঙ্কা, শ্রেণিকক্ষে সংক্ষিপ্তভাবে পড়িয়ে কোচিংয়ে বিস্তারিত শেখানো হচ্ছে—এমন ধারণা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।
একজন অভিভাবক বলেন, “একই শিক্ষক ক্লাসেও পড়ান, আবার কোচিংয়েও পড়ান। তখন কোচিংয়ে না গেলে সন্তান পিছিয়ে পড়বে—এমন ভয় কাজ করে। স্কুলেই যদি পুরো পড়া বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আলাদা কোচিংয়ের প্রয়োজন কী?”
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্য, “বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষক ব্যবহার করে যদি নিজস্ব শিক্ষার্থীদের নিয়েই কোচিং বাণিজ্য চলে, তবে তা নৈতিকতার পরিপন্থী। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়।”
জগদল দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ে দুইজন শিক্ষক অতিরিক্ত ক্লাস (এক্সট্রা ক্লাস) পরিচালনা করছেন এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আদায়কৃত অর্থের ১০ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের এক ধর্ম শিক্ষক। তিনি বলেন, এখানে কোনো কোচিং করানো হচ্ছে না, আমরা শুধু এক্সট্রা ক্লাস নিচ্ছি। প্রধান শিক্ষকের উল্লেখ করা ১০ শতাংশ অর্থ প্রদানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা কোথাও কোনো টাকা দিই না—না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, না প্রধান শিক্ষককে।
দুই শিক্ষকের পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, এক্সট্রা ক্লাসের আড়ালে কোচিং বাণিজ্য চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে জগদল নুর আক্তার সরকার দ্বিমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
শিক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানই শিক্ষার্থীদের মূল ভরসা হওয়ার কথা। কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। তবে একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্থের বিনিময়ে আলাদা কোচিং সম্পর্ক গড়ে উঠলে তা শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সমতার প্রশ্ন তোলে।
এ বিষয়ে পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুকারিৎফুল কবির মো. কামরুল হাসান বলেন, সর বিধিমালা অমান্য করে কোনো বিদ্যালয়ের ভবনে প্রাইভেট বা কোচিং পরিচালনা করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image
Share This

COMMENTS