ফুলবাড়ীতে থামছেই না চুরি; এবার শিক্ষকের বাড়িতে চোরের হানা


মোস্তাক আহম্মদ
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে চুরির ঘটনা। এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী। থানায় বারবার অভিযোগ দিয়েও চুরি বন্ধ না হওয়ায় নিজেরাই রাত জেগে দিচ্ছেন পাহারা। গত ১১ আগষ্ট দিবাগত রাতে চোর চক্রের আটজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছেন গ্রামবাসী। তারপরও নতুন নতুন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে চুরি হচ্ছে মালামাল। সম্প্রতি সড়কে গাছ ফেলে এই স্থানে কয়েকবার ডাকাতি হলেও দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি পুলিশের।
এরই মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে পৌর এলাকার ৭ নং ওয়ার্ডের পূর্ব কাঁটাবাড়ী গ্রামে ঘরের ভ্যান্টিলেটর ও তালা ভেঙে সৈয়দ সাইফুল ইসলাম নামের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের বাড়ি থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণসহ বিভিন্ন মালাল চুরি হয়ে গেছে। এ ঘটনায় ওই শিক্ষক বাদী হয়ে আজ বুধবার বিকেলে ফুলবাড়ী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এদিকে বিষয়টি নিয়ে ওসির সাথে কথা বললে তিনি অভিযোগের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন।
থানায় দায়েরকৃত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ফুলবাড়ী জিএম পাইলট উচ্চ বিদ্যায়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম ও তার পরিবারের লোকজন বাড়িতে ছিল না। গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে পৌর এলাকার ৭নং ওয়ার্ডের পূর্ব কাঁটাবাড়ী গ্রামে তার বাড়ির ভ্যান্টিলেটার ও তালা ভেঙ্গে বাড়িতে প্রবেশ করে ঘরের আলমিরা, ওয়েড্রপের ড্রয়ারসহ সকল জিনিসপত্র তছনছ করে রাখে। বাড়িতে থাকা একটি বড় স্ট্যান্ড ফ্যান, একটি ব্লেন্ডার মেশিন, একটি এলইডি টিভি, ১টি মোবাইল ফোন এবং নগদ ৩৫ হাজার টাকাসহ অর্ধ ভরি ওজনের স্বর্ণ চুরি করে নিয়ে যায়। যার মোট ক্ষতির পরিমান প্রায় দেড় লাখ টাকা।
শিক্ষক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম বলেন, চুরির বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানা পুলিশের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি পুলিশের সেই সক্ষমতা আছে।
জানা যায়, গত এক মাসে ফুলবাড়ী উপজেলার পৌর এলাকার কাঁটাবাড়ী, মধ্যগৌরী পাড়াসহ শিবনগর ইউনিয়নের রাজারামপুর, ডাঙাপাড়া, দক্ষিণপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০টি চুরির ঘটনা ঘটেছে। বাদ যায়নি সরকারি দপ্তরও।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়েও রাতের আঁধারে তালা কেটে চুরির ঘটনা ঘটেছে। একই এলাকায় কয়েকবার এমনকি একই বাড়িতে পরপর তিনবার চুরির খবরও পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীরা প্রতিবার থানায় লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ জুলাই ফুলবাড়ী পৌর এলাকার পশ্চিম কাঁটাবাড়ী এলাকার মৃত মিন্টু সরকারের ঘরের জানালা ভেঙে প্রায় ৫ ভরি স্বর্ণসহ ১ লাখ টাকা চুরি হয়। ১ আগস্ট ফুলবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যগৌরীপাড়া গ্রামের রায়হান চৌধুরীর বাড়িতে গভীর রাতে ঘরের জানালা ভেঙে ৩ ভরি স্বর্ণ, ৭ ভরি রুপাসহ মোবাইল ফোন, আসবাবপত্রসহ ৫০ হাজার টাকা চুরি হয়। সপ্তাহ না কাটতেই একই এলাকার হাফিজুল ইসলামের বাড়ি থেকে আসবাবপত্রসহ টাকা চুরি হয়। ৬ আগস্ট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের জানালার গ্রিল কেটে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। সিসি ক্যামেরায় দেখা গেলেও চোরকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলার ৭ নম্বর শিবনগর ইউনিয়নের রাজারামপুর এলাকার অবস্থা আরও খারাপ। গত ১০ আগস্ট রাজারামপুর দক্ষিণপাড়ার মোরসালিন হাজির বাড়িতে চুরি হয়। কেমিক্যাল স্প্রে করে গ্রিল কেটে ৫ ভরি স্বর্ণ, সাড়ে ৮ লাখ টাকা ও ৪ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল চুরি করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্য আব্দুল ওয়াহাব মিয়ার বাড়ি থেকে দুই জোড়া স্বর্ণের বালা, কানের ঝুমকা, চেইন ও মোবাইল ফোন চুরি হয়ে যায়। পার্শ্ববর্তীতে রুবেল মিয়ার গোয়াল থেকে ২টি বিদেশি গাভি চুরি হয়। ভিমলপুর গ্রামের কোরবান আলী আজাদের বাসা থেকে ২৭ জুলাই রাতে একটি ডিসকভার ১৩৫ সিসি মোটরসাইকেল চুরি হয়। একই গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের একটি দোকানে পরপর তিনবার চুরি হয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকার মালপত্র নিয়ে যায়। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে গবাদিপশু, আসবাবপত্র, অটোচার্জার, অটোভ্যান ও রিকশা চুরি হচ্ছে। এছাড়াও সম্প্রতি ফুলবাড়ী-কয়লাখনি সড়কের বগড়া গ্রামে সড়কে গাছ ফেলে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এতে গাড়ি থামিয়ে অস্ত্রের মুখে চালক ও যাত্রীদের কাছে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ডাকাতি করা হয়। একই স্থানে এর আগেও কয়েকবার ডাকাতি হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি থানা পুলিশ। এতে পুলিশের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে ভুক্তভোগীদের।
ভুক্তভোগী শাহানা পারভীন, রোকনুজ্জামান রনি, মাজেদুর রহমান, মোরসালিন ইসলাম জানান, প্রতিটি চুরির ধরন প্রায় একই রকম। চোরেরা ঘুমের ওষুধজাতীয় কিছু স্প্রে করে সবকিছু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। একই গ্রামে বারবার চুরির ঘটনায় প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও চুরি বন্ধ হয়নি, পুলিশ তেমন কোনো জোরদার ব্যবস্থাও নিচ্ছে না।
রাজারামপুর ডাঙাপাড়া বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এক সপ্তাহে ৫টি চুরিসহ সম্প্রতি ১০-১২ চুরি সংগঠিত হয়েছে এই এলাকায়। প্রতিটি চুরির ঘটনার পর থানায় অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে আমরা নিজেরা রাত জেগে পাহারা বসিয়েছি। চুরি করতে আসা কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে একই গ্রামের চিহ্নিত চোর দেলোয়ার হোসেনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মোরসালিন হাজির চুরি যাওয়া টাকার মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, কিছু স্বর্ণ ও কিছু সৌদি রিয়াল উদ্ধার করা হয়।
শিবনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সামেদুল ইসলাম বলেন, একই এলাকায় বারবার চুরির বিষয়টি রহস্যজনক। এটি একটি বড় চোর চক্র। তাদের চুরির ধরন অনেক আধুনিক। এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে রাত জেগে পাহারা বসিয়েছেন। তাঁরা আটজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছেন।
ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম খন্দকার মুহিব্বুল বলেন, স্কুল শিক্ষকের বাড়িতে চুরির অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই, তবে যদি দিয়ে থাকে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
