
আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে এক অনন্য সাহস ও অধ্যবসায়ে জ্বলন্ত প্রদীপ শারীরিক প্রতিবন্ধী মো. আব্দুর রহিম। জন্মগতভাবে সুস্থ্য থাকলেও দুর্ঘটনার কারণে-দুই পা আজ সম্পূর্ণ অচল। নাই কোন পৈত্রিক সম্পত্তি কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁকে জীবনের লক্ষ্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যও পিছিয়ে দিতে পারেনি বরং প্রতিদিনের সংগ্রামই তাঁকে আরও শক্তিশালী করে তুললেও এখন সে কিডনী সমস্যায় আক্রান্ত।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রহিমের বাবা ঘুতু মন্ডল ২০১২ সালে মারা যাওয়ার পর থেকেই সে সংসার জীবনে দায়িত্বভার কাঁধে নেন। নিজের কোন পৈত্রিক সম্পত্তিও নেই, তিনি উপজেলার মহাশ্বসানের দক্ষিণ পার্শ্বে স্বর্গীয় মহল্লাল এর ছেলে প্রদীপ কুমার আগরওয়ালা তাকে ৪ শতক জায়গা নোটারি করে ভারত গেছেন। সেখানে তাঁর মা, স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক ছেলে নিয়ে রহিমের বসবাস। ইন্ডিয়ার ভেলুরে নিউরোলজি ডাক্তার এর চিকিৎসা করিয়েছেন ইনতেফা কোম্পানীর মালিক আবু দাউদ ইব্রাহিম ডিআই কাজীর আর্থিক সহায়তায় বেশ কিছু মাস সুস্থ ছিলেন রহিম। ২০০৫-২০১৫ সাল পর্যন্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে কম্পিউটার অপারেটর অস্থায়ীভাবে চাকুরী করতেন রহিম। দু’পা অচল হওয়ায় গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করলেও এখন কিডনী সমস্যায় ভুগছেন মাথা ভর্তি সংসারের চিন্তা নিয়ে। তিনি বগুড়া পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কিডনী স্পেশালিষ্ট ডা. আহসান হাবিব এর পারামর্শে আছেন, সেখানে প্রতিমাসে ঔষধ ছাড়া ডাক্তার ভিজিট ও রিপোট বাবদ গুনতে হয় ৬ হাজার টাকা।
উপজেলার সামনে হোচিমিন পাইলট প্রিন্টিং হাউজে বসেই তিনি করে থাকেন ব্যানার, পোস্টার, লোগো, বিজনেস কার্ডসহ বিভিন্ন ডিজাইনের কাজ। আধুনিক সফটওয়্যারে দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা ও নির্ভুল কাজে তিনি স্থানীয়ভাবে ইতোমধ্যেই পরিচিত একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার। গ্রাহকদের সঙ্গে তাঁর আচরণ, সময়মতো কাজ সরবরাহ এবং কাজের মান-সবকিছুর সমন্বয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন সবার আস্থার জায়গা।
আব্দুর রহিম বলেন, দুই পা অচল হয়ে জীবনযুদ্ধে লড়াই করা হামার জন্য সহজ আছলনা। তবুও ভাগ্যবান আমি, কারণ কর্মস্থলে হোচিমিন ও পাইলট ভাইয়ের মতো মানুষ আছিলো। তারা শুধু আমাকে বেতনই দেন না- বরং নানা সময় নানাভাবে আর্থিক সহায়তা ও মানসিক সমর্থন দিয়ে পাশে দাঁড়াছে। তার ভাষ্য দুই পা অচল হয়ে জীবনযুদ্ধে লড়াই করা তার জন্য সহজ ছিল না। তবুও ভাগ্যবান সে, কারণ তার কর্মস্থলে হোচিমিন ও পাইলটের মতো মানুষ ছিল। তারা শুধু তাকে বেতনই দেন না—বরং নানা সময় নানাভাবে আর্থিক সহায়তা ও মানসিক সমর্থন দিয়ে পাশে দাড়িয়েছে।
রহিম আরও জানান, শারীরিক অবস্থার কারণে স্বাভাবিকভাবে বাথরুমে যাওয়া সম্ভব হত না। অনেক সময় দোকানেই প্রস্রাব-পায়খানা করতো, সুধু তাই নয় পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে হঠাৎই অপ্রীতিকর অবস্থায় পোশাক নষ্ট হয়ে যায় তার। কিন্তু কখনোই দোকানীরা তাকে ছোট করে দেখেনি, বিরক্তও হননি বা অবমূল্যায়ন করেননি বরং অত্যন্ত মানবিকভাবে বিষয়গুলো বুঝে নিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে-ওনাদের জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তো তাকে চাকরিই দিতো না, কিংবা এই বিশেষ সুবিধাগুলো দেওয়া আরও কঠিন হতো। কিন্তু তারা রহিমের সীমাবদ্ধতাকে দুর্বলতা না ভেবে, মন দিয়ে বোঝেন এবং সবসময় তাকে সম্মান করেন।
দোকান মালিক পাইলট বলেন, রহিম শুধু আমার কর্মী নয়, পরিবারের একজন সদস্য। অসুস্থতার মধ্যেও সে দায়িত্ব পালনে চেষ্টা করে-এটা আমাদের সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। আমরা সব সময় তাকে সম্মান করি ও পাশে থাকার চেষ্টা করি। বৃতবান মানুষরা যদি একটু সহযোগিতা করে, রহিমের মতো হাজারো রহিম আরও সাবলিন ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা জানান, বাবার সম্পত্তি নেই, দুর্ঘটনায় দু’পা হারিয়েছেন, এখন কিডনি সমস্যা। সহায়তা পেলে তিনি সুস্থ হয়ে বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখতে পারবেন।
উপজেলার সমাজসেবা অফিসার মো. সাজেদুর রহমান জানান, রহিমে সংগ্রাম ও প্রতিভা সত্যিই প্রশংসনীয়। মানুষ ইচ্ছা করলে কিনা করতে পারে বর্তমানে তিনি প্রতিবন্ধি ভাতা পাচ্ছেন। দুই পা অচল হয়েও নিজের সাহস, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে তিনি শুধু নিজের পরিবারের হালই ধরেননি বরং সমাজের হাজারো প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য হয়ে উঠেছেন অদম্য অনুপ্রেরণা।