রাতের আঁধারে ব্যবসায়ীদের আলু কোল্ড স্টোরেজে, হয়রানিতে কৃষক


কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
জয়পুরহাট জেলার কৃষকরা একদিকে আলুর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ, অন্যদিকে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ নিয়েও নানা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। কৃষকদের দাবির মুখে সরকার প্রতি কেজি আলুর সংরক্ষণ খরচ সর্বোচ্চ ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং হিমাগারে সংরক্ষণের অনুমতিপত্র (কার্ড) পেতে কৃষকদের নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
কয়েকজন কৃষক বলেন, এখন অধিকাংশ হিমাগারগুলো মূলত ব্যবসায়ীদের দখলে।কৃষকেরা চাইলেও সহজে সংরক্ষণের অনুমতিপত্র পাচ্ছেন না। যারা কার্ড সংগ্রহ করতে পেরেছেন, তাদেরও দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অথচ ব্যবসায়ীদের ট্রাকভর্তি আলু প্রতিদিন হিমাগারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, হিমাগারে ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে কৃষকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কালাই উপজেলার বাইগুনী গ্রামের কৃষক তাজউদ্দিন আহমেদ বলেন,‘কয়েকদিন ধরেই হিমাগারের সামনে ধরনা দিয়েও আলুর সংরক্ষণের অনুমতিপত্র পাইনি। অথচ আমাদের বাড়ির পাশের হিমাগারে প্রতিদিন রাতের আঁধারে ব্যবসায়ীদের আলু সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
উপজেলার এলতা গ্রামের কৃষক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘হিমাগারে ৬৫ বস্তা আলু রাখার জন্য দুদিন ধরে অপেক্ষা করছি। শত শত বস্তা আলু নিয়ে আমরা কৃষকরা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু আমাদের আলু নেওয়া হচ্ছে না। অথচ শুনছি, রাতে ব্যবসায়ীদের আলু ঠিকই সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে হিমাগার কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, কৃষকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও কিছু আলু সংরক্ষণ করতে হয়। কারণ তারা নিয়মিত হিমাগারের সুবিধা নেন। তবে কৃষকদের অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয় বলে জানিয়েছেন উপজেলার বৈরাগীহাটের সাউথ পোল কোল্ড স্টোরেজের জয়ন্ত কুমার।
তিনি আরও বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৬০ শতাংশ কৃষক এবং ৪০ শতাংশ ব্যবসায়ীদের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে ৮০ শতাংশ কৃষকের আলু সংরক্ষণ করা হয়। কৃষকরা এখন শুধু বীজ নয়, বিক্রির জন্যও আলু সংরক্ষণ করতে চাইছেন। ফলে হিমাগারে চাপ বেড়েছে।
কালাই উপজেলার এম ইসরাত হিমাগারের ব্যবস্থাপক রায়হান মন্ডল বলেন, গত বছর প্রতি কেজি আলুর সংরক্ষণ খরচ ছিল ৬ টাকা, যা ব্যাংক সুদ ও শ্রমিকের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এবার ৮ টাকা নির্ধারণ করেছিল হিমাগার অ্যাসোসিয়েশন। তবে কৃষকদের দাবির মুখে সরকার সেটি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে। ফলে হিমাগারে চাপ বেড়েছে এবং আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবার জেলায় ৪৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে, যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৬৬ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন। তবে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ১০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি আলু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, জেলার ১৯টি হিমাগারে মোট সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। কৃষকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও আলু সংরক্ষণ করায় সংকট আরো তীব্র হয়েছে।
জয়পুরহাট জেলার কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, হিমাগারে কৃষকদের কোনো হয়রানি করা যাবে না, এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি কেউ নিয়ম ভঙ্গ করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সার্বিকভাবে পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে।
