শুক্রবার, ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

স্কুলের জমি দখল ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক বরখাস্ত


খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নের টংগুয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুলের জমি কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে ঘর-বাড়ি নির্মাণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খোদ ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক শতীশ চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে। এর প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ঐ স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী রহিদুল ইসলাম রাফি, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি গোলাম রব্বানী ও চিত্তরঞ্জন রায় এবং স্থানীয় বাসিন্দা মহিউদ্দিন।

খানসামা উপজেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম ও বিদ্যালয়ের স্বার্থ পরিপন্থী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক শতীশ চন্দ্র রায়কে তিরস্কারসহ চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে  শুক্রবার (৮ নভেম্বর) নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. তাজ উদ্দিন। সেই সাথে জ্যৈষ্ঠ শিক্ষক আমিনুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে মো. আনিছুর রহমানকে দায়িত্ব প্রদান করেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি।

ঐ স্কুলের এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে ঐ স্কুল পরিদর্শন ও সার্বিক বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তাজ উদ্দিন এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশিক আহমেদসহ তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

উল্লেখ্য, গত ০৫ আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর
জমি দখল, আর্থিক অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সতীশ চন্দ্র রায়ের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। ইতিপূর্বে এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়েও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যান অভিযুক্ত এই প্রধান শিক্ষক।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দায়েরকৃত লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় জনসাধারণের উদ্যোগে জমি সংগ্রহ ও অবকাঠামো নির্মাণ করে সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয়টি নির্মাণ করা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে চিত্তরঞ্জন রায় প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ৮ আগস্ট ১৯৯৬ সালে নিম্ন মাধ্যমিক/উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুকুলে ৩০২৮ নং দানপত্র দলিল মূলে বিভিন্ন দাগে ১ একর ৩০ শতাংশ জমি দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত খানসামা থানাধীন ২নং ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নের টংগুয়া মৌজায় টংগুয়া আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি বরাবরে পার্শ্ববর্তী নীলফামারী জেলার দুকুড়ী এলাকার গয়চাঁদ ব্রজবাসীর ছেলে হরেক চাঁদ ব্রজবাসী পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত নিজ দখলীয় জমি রেজিস্ট্রি দেয়। সেই মোতাবেক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জমির খাজনা পরিশোধ করে ব্যবহার করে আসছে এবং জমির স্কেচ ম্যাপে যা দৃশ্যমান রয়েছে। কিন্তু ঐ বিদ্যালয়ে ১৯৯৭ সালের ২৯ আগস্ট প্রধান শিক্ষক পদে সতীশ চন্দ্র রায় তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি চিত্তরঞ্জন রায়ের নিয়োগপত্রের আলোকে গত ০১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ ইং তারিখে যোগদানের পর থেকেই বিপত্তি ঘটে। সতীশ চন্দ্র রায় বিদ্যালয়ের জমি সংরক্ষণ না করে প্রধান শিক্ষক হওয়া স্বত্বেও বিদ্যালয়ের জমি বিদ্যালয়ের নামে সংশোধনী রেজিস্ট্রি না নিয়ে অন্য ওয়ারিশের কাছে নিয়মবহির্ভূত ভাবে তার নিজ নামে ৪৮ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে নেয়। এই অংশে স্কুলের খেলার মাঠ ছিল। এই প্রধান শিক্ষক কৌশলে জমি হাতিয়ে নেওয়ার পরে এখন আধাপাকা বাড়ী নির্মাণ করে তার নিজ দখলে নিয়ে বসবাস ও দোকান ভাড়া দিয়েছেন। এছাড়াও বিদ্যালয়ের জমি ও পুকুর নিয়ম ছাড়াই গোপনে অর্থের বিনিময়ে এক ব্যক্তিকে দিয়েছেন বলে জানা যায়।

এসব অভিযোগের সূত্র ধরে সরেজমিনে ঐ স্কুলে গিয়ে সত্যতা পেয়েছে পাওয়া গেছে। দেখা যায়, টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে আধা-পাকা বাড়ি নির্মাণ করে ব্যবহার করছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা রহিদুল ইসলাম রাফি বলেন, প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ের সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল যার, তিনিই নিজেই সম্পদ দখল করেছেন। বেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার মত অবস্থা। যা আসলেই মেনে নেওয়ার মত নয়। তাই আমরা এর প্রতিকার চেয়ে আন্দোলন করেছি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক সতীশ চন্দ্র রায কোন সদুত্তর দিতে পারেনি। তিনি বলেন, নিয়ম মেনেই আমি জমি রেজিস্ট্রি নিয়েছি। তবে ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে খোদ স্কুলের জমি দখল বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি ইউএনও স্যার তদন্ত করছে। যদি আমার জমি না টিকে তাহলে তিনি যেটা করবেন ওটা এখানে তো আর আমার কিছু বলার নাই। তবে স্কুলের জমি অন্যজনকে নিয়ম না মেনে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলা তো অনেক আগের ঘটনা। এত জানাশোনা ছিল না তাই হয়ে গেছে। তবে রেজুলেশন করে লিজ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তাজ উদ্দিন বলেন, অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সতীশ চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ নিয়ম মেনে ধারাবাহিকভাবে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করে আনিছুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সেই সাথে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত ও লেখাপড়ার মানোন্নয়নে মনোযোগী হতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান এই কর্মকর্তা।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image
Share This