বৃহস্পতিবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অটো রাইস মিলের ছাই-বর্জ্যে দূষণের নগরী সেতাবগঞ্জ

বোচাগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ পৌর এলাকা ও আশপাশের জনপদ এখন ধোঁয়া, ছাই ও দূষণের নগরে পরিণত হয়েছে। অটো রাইস মিলগুলোর ছাই এবং দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য পানির কারণে স্থানীয় পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ১৭ বছর ধরে এ সমস্যা চলমান থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বোচাগঞ্জ খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর ৩৭টি অটো রাইস মিল নবায়ন করা হয়েছে। তবে বোচাগঞ্জ পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ কমিটির তথ্যমতে, উপজেলায় ৪৪টি অটো রাইস মিল রয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি রয়েছে পৌর এলাকায়। নবায়নপ্রাপ্ত কোনো মিলেই তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) নেই। অনেক মিল কর্তৃপক্ষ তাদের বর্জ্য নদী, পুকুর কিংবা নিজস্ব জমিতে ফেলছে। ফলে দুর্গন্ধযুক্ত পানি ও ছাই প্রতিনিয়ত নদী-খাল দুষিত করছে। মাত্র পাঁচ-সাতটি মিলে ছাই নিয়ন্ত্রণের সাইক্লোন মেশিন থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার নেই বললেই চলে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সেতাবগঞ্জ পৌর এলাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত সোয়া নদী(খাল) ও ইশানিয়া ইউনিয়নের রাক্ষসিনী নদীতে মিলের বর্জ্য সরাসরি পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, গত ১৭ বছরে এসব দূষণের কারণে প্রায় ৪৫ প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী ১০ বছরে এ নদীগুলো সম্পূর্ণভাবে জীববৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়বে।
সেতাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা এমওয়ালী ফ্লাড বলেন, আমাদের সোয়া নদীতে আগে বেলে আর তারা বাইম মাছ পাওয়া যেত। এখন আর পাওয়া যায় না। মাছগুলো একেবারেই হারিয়ে গেছে। পৌর এলাকার আরেক বাসিন্দা শুভ ইসলাম বলেন, সকালে ঘর থেকে বের হতে চশমা আর মাস্ক পরা ছাড়া উপায় নেই। ছাই চোখে পড়লে প্রচন্ড জ্বালা করে। একই এলাকার সিদ্দিকুর রহমান অভিযোগ করেন, অটো রাইস মিলের ছাই টিনের চালা, গাছের পাতা, এমনকি খাবারের মাঝেও পড়ে। কাপড় শুকাতে দিলে কালো দাগ পড়ে যায়। এ দূষণ এখন আমাদের নিত্যদিনের যন্ত্রণা।
স্থানীয় আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র রাবিদ জানায়, বাড়ির বাইরে খেলতে গেলে চোখে ছাই পড়ে চোখ লাল হয়ে যায় এবং জ্বালা করে। পরে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। পরিবেশ একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের উপজেলা সভাপতি এমএ তাফসীর হাসান অভিযোগ করেন, সেতাবগঞ্জ পৌর এলাকায় নিয়মবহির্ভূতভাবে একের পর এক অটো রাইস মিল গড়ে উঠছে। এর ফলে সোয়া নদী ধ্বংসের মুখে পড়েছে, গাছ-মাছ কিছুই টিকে নেই। তিনি সতর্ক করে বলেন, বোচাগঞ্জে মিলগুলোর দেড় কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। মিলগুলো পরিবেশবান্ধব করা না হলে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
সরেজমিন দেখা যায়, মুশিদহাট মালিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোলেই অবস্থিত সালেহা অটো রাইস মিল। বিদ্যালয়ের প্রাচীর ঘেঁষেই স্থাপিত এই মিল থেকে ধোঁয়া, ছাই ও শব্দে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কমল চন্দ্র রায় এ বিষয়ে বলেন, মিল স্থাপনের সময় আগের সরকারের কিছু প্রভাবশালী লোক আমাকে চাপ দিয়ে লিখিত নিয়েছিল। আমি তখন নিরূপায় ছিলাম। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য দিতে পারছি না। স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বিজয় কুমার রায় বলেন, ছাই ও ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসজনিত জটিলতা, অ্যালার্জি ও চর্মরোগ দিন দিন বাড়ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ সালে গড়ে প্রতিদিন দুই-তিনজন এ ধরনের রোগে চিকিৎসা নিতেন। চলতি বছর প্রতিদিন গড়ে ছয়-সাতজন রোগী এসব সমস্যায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। গাউসুল আজম বিএনএসবি আই হসপিটাল দিনাজপুর পরিচালিত সেতাবগঞ্জ ভিশন সেন্টার ও চক্ষুসেবা ও পরামর্শ কেন্দ্রের ইনচার্জ আবু সাঈদ মন্ডল জানান, চোখে ছাই পড়ার কারণে কর্নিয়ায় আলসারের প্রবণতা বেড়েছে।
একাধিক অটো রাইস মিলের শ্রমিকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মিলের বাইরে যেমন ছাই পড়ে, ভেতরেও আমরা যারা কাজ করি, আমাদের গায়েও ছাই পড়ে। ধানের খোসা (তুষ)বস্তায় ভরার সময় ছাই ও ধূলা চোখে পড়ে, তখন চোখ লাল হয়ে যায়। তারা আরো বলেন, মিলে কাজ করলে মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ি। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিন্তু কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজে ফিরি। পেটের দায়ে সব সহ্য করতে হয়।

বোচাগঞ্জ পরিবেশ শদূষণ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাইনুল ইসলাম (বুলু) জানান, ১৭ বছর ধরে মিলগুলো স্থানীয় পরিবেশ ধ্বংস করছে। সব জায়গায় অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। দেশীয় গাছপালা ও মাছ বিলুপ্ত প্রায়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।
বোচাগঞ্জ এসপি অটো রাইস মিলের মালিক সুবাস চন্দ্র রায় এ ব্যাপারে বলেন, আমাদের শোধনাগার নেই। আমরা দুই বছর সময় নিয়েছি। উত্তরা অটো রাইস মিলের মালিক আলতাফুর রহমান বলেন, আমার শোধনাগার নেই। আমি আমার নিজস্ব জমিতে বর্জ্য ফেলি। নদীতে কিছু ফেলি না।
বোচাগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিসার প্রণব রায় জানান, বোচাগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে চারটি নদী প্রবাহিত। এর মধ্যে দুটিতে অটো রাইস মিলের বর্জ্য ফেলা হয়। ফলে পানি দূষণ হচ্ছে। বলা যায়, এ দুটি নদী থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত। দেশীয় মাছ ধরে রাখতে গেলে নদীগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ হাসান বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। সেটি জেলায় পাঠানো হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বদরুন্নাহার সীমার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সদ্য যোগ দিয়েছি, সব রেকর্ড আমার হাতে নেই। তবে যেসব মিল অতিমাত্রায় দূষণ করছে, তাদের ফাইল ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। শিগগির তাদের তলব করা হতে পারে।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image
Share This