বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আক্কেলপুরে ঘরে ঘরে কুটির শিল্প: ঝুট কাপড় থেকে সংগ্রহ হচ্ছে সুতা

আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
আধুনিকতার ঢেউয়ে যখন গ্রামবাংলারের বহু ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তখনও জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার রায়কালীর গুডুম্বা, মাঝিপুকুর সহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামে ঝুট কাপড় থেকে সুতা তোলার কাজ টিকে আছে।
এই গ্রামগুলোর অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন মাটির বাড়ি গ্রামবাংলার নান্দনিক ঐতিহ্যের সরাসরি সাক্ষ্য বহন করছে। বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে রয়েছে নানা রঙ্গের নকশা গড়পরতা একটি গ্রামে অন্তত ২০–২৫টি প্রাচীন মাটির বাড়ি আজও অবিকৃত অবস্থায় আছে। দৃষ্টিনন্দন এসব বাড়ির উঠান ও ঘরের ভেতর বসেই নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ঝুট কাপড় থেকে সুতা তোলার কাজ করেন।
স্থানীয় কারিগররা ঝুট কাপড় থেকে সুতা তোলার কাজ শুধু শীত মৌসুমেই নয় সারাবছর প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করলে দিনে প্রায় দেড় মন পর্যন্ত সুতা তোলা সম্ভব। তোলা সুতার মধ্যে থাকে লাল, নীল, সবুজ ও নানা বাহারী রঙের সুতা, যা দেখলেই নজর কাড়ে। সুতা তোলার প্রক্রিয়াটি শ্রমসাধ্য হলেও আধুনিক সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে অনেক কারিগর এখন সুতা তোলার মেশিন ব্যবহার করছেন। কাঠের চরকি মেশিনগুলোর মেশিনের বর্তমান দাম প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। মেশিন ব্যবহার করলে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায় এবং দৈনন্দিন আয়ও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এই সুতা গ্রামীণ ও শহুরে গার্মেন্টস শিল্পেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়।
স্থানীয়রা বলেন, সুতার মান ও রঙভেদে দামও ভিন্ন। উন্নতমানের সুতা কেজি প্রতি ৬০ টাকা, আর সাধারণ মানের সুতা কেজি প্রতি ৬ টাকা। সারাদিনে ভালোভাবে কাজ করলে একজন কারিগর প্রায় ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকার সমমূল্যের সুতা তুলতে পারেন। তবে পাইকারি পর্যায়ে বিক্রির সময় তারা ন্যায্যমূল্যের বড় অংশ হারান। সাধারণ মানের সুতা কেজি প্রতি মাত্র ৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়।
কারিগর বিলকিস (৫৮) বলেন, ভালো মানের সুতা তুলতে পারলে আয় কিছুটা বেশি হয়। কিন্তু সব সময় সেই সুযোগ থাকে না। বাজারে গেলে দাম কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে সময় ও শ্রম দুটোই ভাগ করতে হয়। রায়কালির সুতা তোলা কেবল অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ও বটে। এই সুতা তোলার ঐতিহ্য অনেক পরিবারে প্রজন্মান্তরে চলে আসছে।
পাশের আদমদিঘী উপজেলার শাঁওইল গ্রামের ব্যবসায়ীরা তোলা সুতা গুলো নিয়ে গিয়ে চাদর, কম্বল, শাল, মাফলার ও তোষকের কভারসহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি তো হচ্ছেই সেই সাথে এখন এসব সুতা থেকে দড়ি/রশিও তৈরি করা হচ্ছে।
একারণেই শুধু সুতা ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই শাঁওইল হাট কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় হাজার দোকান। বর্তমানে প্রতিদিন ঢাকা থেকে বাস ও ট্রাকযোগে অন্তত ১৫ গাড়ি ঝুট শাঁওইলে আসছে। আবার এখান থেকেই সুতা যাচ্ছে ঢাকা, নরসিংদীর বাবুরহাট, কুষ্টিয়ার কুমারখালী, গাইবান্ধার কোচাশহর, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়।
দেশের চাহিদা মিটিয়ে বর্তমানে ভারত, নেপাল ও ভুটানেও রপ্তানি হচ্ছে এখানকার সুতা। ঝুট কাপড় থেকে এখানে নানা রঙের প্রায় ৫০ ধরনের সুতা উৎপাদিত হয়।
গাইবান্ধার কোচাশহর থেকে শাঁওইল বাজারে সুতা কিনতে আসা ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, এখানকার সুতার মান খুব ভালো। ঢাকা থেকে চাদর কিনতে আসা ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন,এখানকার মালপত্রের মান খুব ভালো। দামও কম। সে কারণে বছরজুড়েই এখান থেকে কম্বল ও চাদর কিনে আড়তে মজুত করি।
কারিগরদের মধ্যে কয়েকজন এখন গ্রামের শিশুদেরও শেখাচ্ছেন যাতে বাবব দাদাদের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেন কিভাবে সুতা তুলতে হয় এবং কিভাবে বিভিন্ন রঙের সুতা তৈরি করা যায়।
জয়পুরহাট বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, ন্যায্যমূল্য এবং সরাসরি বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা হলে এই ঐতিহ্যবাহী সুতা তোলার শিল্প আরও প্রাণ ফিরে পাবে। একই সঙ্গে প্রাচীন মাটির বাড়ির সংখ্যা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত রেখে করা প্রয়োজন। সুতা তোলা ও মাটির বাড়ির নান্দনিকতা একত্রিত হলে এটি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ভান্ডার হিসেবে বিকশিত হতে পারে। স্থানীয় হস্তশিল্পকে শহরের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে কারিগরদের আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ পর্যটনের প্রসার সম্ভব।

Share This