ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়েছে আক্কেলপুরের দর্জিরা পাড়ায়


আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার দর্জি দোকানগুলোতে বেড়েছে কাজের চাপ। নতুন পোশাক তৈরির অর্ডার বাড়লেও দক্ষ কারিগরের সংকট এবং সেলাই উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে চাপে পড়েছেন দর্জিরা। ফলে অনেক দর্জিকে রাত জেগে কাজ করেও সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঈদ ঘনিয়ে আসায় দর্জিরা অর্ডার নিতে চাচ্ছে না।
উপজেলার আক্কেলপুর পৌর বাজার, তিলকপুর বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেলাই মেশিনের শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে টেইলার্স দোকানগুলো। ঈদের আগে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্ডার শেষ করতে গিয়ে অনেক দর্জি প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছেন।
স্থানীয় ও টেইলার্স মালিক সূত্রে জানা গেছে, পুরো আক্কেলপুর সদরে প্রায় ৩৫টি টেইলার্সের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ দোকানেই বর্তমানে দক্ষ কারিগরের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক দোকানেই অর্ডারের তুলনায় কর্মী কম থাকায় কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
স্থানীয় দর্জিরা জানান, কয়েক বছর আগেও একটি দোকানে ৪ থেকে ৫ জন কারিগর কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক দক্ষ কারিগর অটোরিকশা চালানো, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় কর্মী সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক দোকানে এখন একজন বা দুজন কারিগর দিয়েই পুরো কাজ সামলাতে হচ্ছে। আবার কিছু দোকানে কোনো আলাদা কারিগর নেই-দোকান মালিক নিজেই সব কাজ করছেন।
আক্কেলপুর বাজারের দর্জি মো.পবন মন্ডল বলেন,ঈদের আগে কাজের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। আগে দোকানে কয়েকজন কারিগর ছিল। এখন কারিগর পাওয়া যায় না। তাই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিজেই কাজ করতে হচ্ছে।বয়স হয়েছে একাই সব করতে হয় তাই আর অর্ডার নিচ্ছি না।
দর্জিরা জানান, শুধু কাজের চাপ নয়-পোশাক তৈরির উপকরণের দামও বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে জর্জেট কাপড়ের দাম প্রতি মিটার প্রায় ৩০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে, যা কাপড়ের মান ও ডিজাইনের ওপর নির্ভর করে।
স্থানীয় টেইলার্স দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- জর্জেট কাপড়ের থ্রি-পিস বা কামিজ সেলাই করতে ৪০০–৪৫০ টাকা, সুতির কাপড়ের পোশাক সেলাই করতে ১৫০–২০০ টাকা, পাঞ্জাবি সেলাই করতে ২৫০–৩৫০ টাকা শার্ট বা প্যান্ট সেলাই করতে ৩০০–৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
দর্জিরা বলেন, একটি পোশাক তৈরিতে শুধু কাপড় নয়-সুতা, কাটিং ফিতা, বোতাম, চেইনসহ বিভিন্ন উপকরণ লাগে। এসব উপকরণের দামও আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় একটি পোশাক তৈরি করতে দর্জিদের মোট খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক দর্জি কারিগর পিস রেট অনুযায়ী কাজ করেন। অর্থাৎ একটি পাঞ্জাবি বা শার্ট সেলাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট মজুরি পান। ফলে অর্ডার বেশি থাকলেও সেই অনুযায়ী আয় বাড়ে না।
এদিকে ঈদের নতুন পোশাক তৈরির জন্য ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়ছে দর্জি দোকানগুলোতে। বিশেষ করে পাঞ্জাবি, শার্ট-প্যান্ট, থ্রি-পিস ও শিশুদের পোশাক তৈরির অর্ডার বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় ক্রেতা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, মেয়ের জন্য থ্রী-পিছ কিনে সেলাই করাতে এসেছি কিন্তু দোকানদার অর্ডার নিতে চাচ্ছে না। প্রতি বছর একই অবস্থা, নতুন প্রজন্ম সেলাই না শিখে তাহলে কারিগর আরও হিমসিম খাবে ভবিষ্যতে।
দর্জিরা জানান, ঈদের সময় কাজের চাপ অনেক বাড়লেও আগের মতো লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ একদিকে কারিগর সংকট, অন্যদিকে কাপড় ও সেলাই উপকরণের দাম বৃদ্ধি-সব মিলিয়ে ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে অনেক সময় অতিরিক্ত অর্ডারও ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
জয়পুরহাট বিসিক শিল্প নগরীর উপ-পরিচালক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, দর্জি ও কারিগরদের দক্ষতা বাড়াতে ট্রেড ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি)-তে সরকারি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এতে স্থানীয় কারিগররা আধুনিক সেলাই কলাকৌশল ও কাপড় তৈরির নতুন প্রযুক্তি শিখবেন, যা তাদের আয়ের সুযোগ বৃদ্ধি করবে এবং ঈদসহ উৎসবের সময় অর্ডার সময়মতো শেষ করতে সহায়ক হবে।
