

নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
প্রায় ৩০ বছর আগে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা সদরের ব্যস্ত জনপদে হঠাৎ করেই দেখা মেলে এক অচেনা নারীর। মানসিক ভারসাম্যহীন এই নারী-যার নেই কোনো পরিচয়, নেই কোনো স্বজনের খোঁজ। তিনি কথা বলতেন এক অজানা ভাষায়, যা কেউ বুঝতে পারত না। তবে দীঘ সময় একই এলাকায় থাকায় হয়ে ওঠেন সবার পরিচিত মুখ। সবাই ডাকেন আমেনা পাগলী নামে। বয়সের ভাবে তার শেষ আশ্রয় হয়েছে মডেল মসজিদের গার্ডরুমে।
জানা যায়, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তিনি নিঃস্বার্থভাবে উপজেলার বিভিন্ন দোকান ও প্রতিষ্ঠানের সামনে ঝাড়ু দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং লেপনের মতো কাজ করে গেছেন। বিনিময়ে কেউ টাকা দিলে তা নিতেন না। কখনো কখনো খাবার গ্রহণ করতেন, আবার অনেক সময় সেটিও ফিরিয়ে দিতেন। রাত কাটাতেন কোনো দোকানের বারান্দায়-নীরবে, নিঃসঙ্গতায়।রাতে বেশিরভাগ সময় সঙ্গী হিসেবে ছিলেন কুকুর। যেহেতু তার পরিচয় কেউ জানতেন না তাই স্থানীয়রা তার নাম দিয়েছিল আমেনা বা আমেনা পাগলী। অনেকের কাছে তিনি জটি পাগলী বলেও পরিচিতি। সময়ের পরিক্রমায় বয়সের ভারে এখন তিনি ক্লান্ত, অসুস্থতায় জর্জরিত। চলাফেরার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। এখন তার শেষ আশ্রয় হয়েছে নবাবগঞ্জ উপজেলা সদরে মডেল মসজিদের ছোট একটি গার্ডরুমে। পরিবার হারা এই নারীর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সহানুভূতি ও সেবার-ঠিক তখনই সামনে আসে এক অনন্য মানবিকতার গল্প। যাদের জন্য তিনি বছরের পর বছর নিরলস সেবা দিয়ে গেছেন, তারা তাকে ভুলে যায়নি।
রামপুর বাজারের ব্যবসায়ী সিরাজ, আখতারুজ্জামান, হারুন হয়ে উঠেছেন তার শেষ ভরসার আশ্রয়। প্রতিদিন তিনি তারা অসহায় নারীকে খাবার দিচ্ছেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করছেন, এমনকি নিজের হাতে তার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বও পালন করছেন- যা আজকের সমাজে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
এ বিষয়ে তাদের সাথে কথা হলে আবেগাপ্লুত কন্ঠে বলেন, এই মাকে আমরা অনেক বছর ধরে দেখে আসছি। তিনি কখনো কারো কাছে কিছু চাননি। কিন্তু নিঃস্বার্থভাবে সবার জন্য কাজ করে গেছেন। আজ যখন তিনি অসুস্থ ও অসহায়, তখন তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এটা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়- এটা তার প্রাপ্য সম্মান।
আমরা বিশ্বাস করি, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় মানবতা। যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন, আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী তার সেবা করে যাবো।
স্থানীয় বিনোদনগর ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য আশরাফুল ইসলাম বলেন- এই নারী আমাদের এলাকার এক নীরব কর্মী ছিলেন। তার অবদান ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আজ তার এই দুর্দিনে সিরাজ, আখতারুজ্জামান, হারুনুর সহ আশেপাশের একাধিক ব্যবসায়ী যে মানবিক উদ্যোগ আমরা দেখছি, তা সত্যিই অনুকরণীয়। সমাজের সকল বিত্তবান ও সচেতন মানুষের উচিত এমন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বর্তমান সময়ে যেখানে অনেক সন্তান নিজ মায়ের প্রতিও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, সেখানে ব্যবসায়ীদের এমন নিঃস্বার্থ সেবা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এই মানবিক উদ্যোগে পুরো সাধুবাদ জানিয়েছে পথচারী ও এলাকাবাসী। এই ঘটনা যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়- মানবতা এখনো বেঁচে আছে, শুধু দরকার একটু সহানুভূতি আর ভালোবাসা।
