দীর্ঘ ৩০ বছরে সরকারি অনুদান বঞ্চিত ফুলবাড়ীর একমাত্র মহিলা কলেজটি


0-4608×2602-0-0#
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্থানীয় রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে নারী শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার একমাত্র “ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজটি” ৩০ বছরেও পায়নি শ্রেণিকক্ষের জন্য সরকারি ভবন কিংবা আর্থিক অনুদান। কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা বর্তমান অধ্যক্ষ মো. খুরশিদ আলম মতি দিনাজপুর জেলা বিএনপি’র উপদেষ্টা এবং স্থানীয় বিএনপি দলে সাথে সংপৃক্ত থাকার কারণে শহরের প্রাণকেন্দ্রে কলেজটির শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং ফলাফল সন্তোষজনক হলেও অবকাঠামোগত দিকে সরকারি সহযোগিতা দৃশ্যমান হয়নি কোনো সরকারের আমলেই। অথচ উপজেলার বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে নেই ভবন পাওয়ার এমন সুসংবাদ থেকে। শিক্ষানুরাগীরা বলছেন, নারীদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, আধুনিক ও মানসম্মত করতে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সাথে সাথে অত্যাধুনিক ভবন এবং সুপ্রশস্ত ক্যাম্পাসের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
জানা যায়, ফুলবাড়ী পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে থানার সামনে ১৯৯৫ সালে কলেজটি স্থাপিত হয়ে এমপিও ভুক্ত হয় ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। স্টাফ সংখ্যা আছে শিক্ষক পর্যায়ে ৩৫ জন এবং অফিস স্টাফ ১৭ মিলে মোট ৫২ জন। পর্যায়ক্রমে কলেজের শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং ফলাফল সন্তোষজনক হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে ঈর্ষান্বিত হতে থাকে কলেজটি। ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজটি সুনামের সাথে পাঠদান করে আসলেও বছরের পর বছর ধরেও সরকারি বিল্ডিং কিংবা আর্থিক অনুদান থেকে অদ্যাবধি বঞ্চিত রয়েই গেছে ।

0-4608×2602-0-0#
এদিকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ফুলবাড়ীতে (প্রাথমিক বাদে) ৬৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারমধ্যে সরকারি কলেজ ২টি, মহিলা কলেজসহ বেসরকারি কলেজ ৪টি, স্কুল এন্ড কলেজ ৩টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩০টি। এরমধ্যে সরকারি ১টি, নিম্ন মাধ্যমিক ৬টি, স্বতন্ত্র এবতেদায়ি ৮টি, মাদ্রাসার মধ্যে দাখিল ৯টি, আলিম ১টি, ফাজিল ৪টি, ভোকেশনাল কলেজ ৩টি।
এসবের প্রায় সিংহভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সরকারিভাবে ভবন পেলেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে ফুলবাড়ীর একমাত্র মহিলা কলেজটি সরকারি বিল্ডিং কিংবা আর্থিক অনুদান থেকে অদ্যাবধি বঞ্চিত।
কলেজের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ছাত্রী সংখ্যা ৬১২ জন। কয়েক বছর ধরে ফুলবাড়ীর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে এই কলেজটি ফলাফলের দিক দিয়েও শীর্ষে রয়েছে। ২০২৩ সালের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পরীক্ষায় পাশের শতকরা হার মানবিক ৮১.৪৮ ভাগ, বিজ্ঞান বিভাগে ৫৯.০২ ভাগ এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৬২.৫০ ভাগ। ২০২২ সালের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পরীক্ষায় পাশের শতকরা হার মানবিক ৭০.৪২ ভাগ, বিজ্ঞান বিভাগে ৪৬.৮৮ ভাগ এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৬২.৫০ ভাগ। ২০২১ সালের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পরীক্ষায় পাশের শতকরা হার মানবিক ৯৮.৮১ ভাগ, বিজ্ঞান বিভাগে ৯০.২০ ভাগ,ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৮০.০০ ভাগ।
এদিকে গত তিন বছরে স্নাতক পর্যায়ের ফলাফলে ২০২০ সালে শতকরা হিসেবে বিএ ৫০ ভাগ, বিএসএস ৬০ ভাগ, বিবিএস ১০০ ভাগ। ২০১৯ সালে শতকরা হিসেবে বিএ ১০০ ভাগ, বিএসএস ৭২.৭৩ ভাগ, বিবিএস ১০০ ভাগ। ২০১৮ সালে বিএ ৮৫.৭১ ভাগ,বিএসএস ৫৮.৩৩ ভাগ, বিবিএস ১০০ ভাগ।
কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের স্বপ্না আক্তার, আমীন তুষ্টি, মুশফিকা মিলি, প্রণীতা রায় বলেন, সামনে আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা। কলেজে পাস করার পর যদি এখানেই অনার্স কোর্স থাকতো তাহলে আমরা স্বাচ্ছন্দে অনার্সটা কমপ্লিট করতে পারতাম। শুনেছি রাজনৈতিক কারণে এই কলেজে কোন সরকারি বিল্ডিং- অনুদান দেয়া হয়না। কলেজে তো সব দল মতের শিক্ষার্থীরাই পড়াশুনা করে। অবকাঠামো না থাকায় আমাদের কলেছজ অনার্স চালু করা হয়নি। এই কলেজে বিল্ডিং না পাওয়াটা রাজনীতির সংকোচনমুখী মানসিকতারাই বহিঃপ্রকাশ।
কলেজের শিক্ষক কায়সার পারভেজ নান্নু, ওয়াহেদুন্নবী নয়ন, আব্দুস ছালাম, এস এম আব্দুল্লাহ এবং মোস্তাক আহম্মদ বলেন, স্থানীয় রাজনীতির কারণে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে আমাদের কলেজটির সাথে। সেকারনে বারবার সুবিধা বঞ্চিত হয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভবন কিংবা কোনো প্রকার অনুদান পাইনি। শিক্ষক-কর্মচারীরা কলেজের উন্নয়নের স্বার্থে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বেতন ব্যাতীত কলেজ তহবিল থেকে কোনো প্রকার টিউশনফি স্টাফরা নেইনা।
যেটুকু কাজ হয়েছে শিক্ষার্থীদের ফরম পুরনসহ অনন্য টাকাসহ স্টাফদের প্রাপ্য অর্থ স্বেচ্ছায় দিয়ে কলেজের ক্লাসরুমসহ অন্যান্য কাজ করা হয়েছে। অথচ উপজেলার অন্যন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কত আগে থেকেই বহুতলভবন- বিভিন্ন ধরনের অনুদান পেয়ে আসছে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপি’র উপদেষ্টা ও স্থানীয় বিএনপি’র নেতা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. খুরশিদ আলম মতি বলেন, আমি উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ছিলাম বলেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে অত্র উপজেলার একমাত্র ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজটি আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে চরমভাবে অবহেলিত এবং উপেক্ষিত হয়ে আসছে। ৩০ বছরেও সরকারি ভবন, আর্থিক অনুদানসহ যেকোনো ধরনের সহযোগিতা থেকে কলেজটিকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আশানুরুপ অবকাঠামোর অপ্রতুলতার কারণে অনার্স কোর্স এবং কারিগরি শিক্ষা শাখাও খোলা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সংসদ সদস্যকে কয়েকবার কলেজে অতিথি করে আনা হয়েছে, তাতেও কোনো সহযোগিতা পাইনি।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন দাস এবং শিক্ষক নেতা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নাজিম উদ্দীন মণ্ডল বলেন, ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজটি নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ন্যায় সরকারের ফ্যাসিলিটিস বিল্ডিং পাওয়ার দাবি রাখে। বর্তমান এবং ভবিষ্যতে ছাত্রী সংখ্যা বিবেচনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন শিক্ষার পরিবেশকে উন্নত করবে। একটি সুপরিকল্পিত ভবন শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক উৎকর্ষ সাধনে সহায়তা করবে। তবে এতদিনেও বিল্ডিং না পাওয়াটা দুঃখজনক!
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নূর আলম বলেন, আমার কিছু বলার নেই; সরকার যা করবে তা-ই।
দিনাজপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) চন্দন গুপ্তা বলেন, স্থানীয় এমপি মহোদয় যেভাবে তালিকা দেন, আমরা সে মোতাবেক কাজ করে থাকি। এককভাবে আমাদের কোনো কাজ করার সুযোগ নেই।
