শুক্রবার, ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিএনপি আমলে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, আ.লীগ আমলে ফাইল গায়েব! দেড় যুগেও তৈরি হয়নি ব্রীজ

পঞ্চগড় প্রতিনিধি
পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের লাখেরাজ ঘুমটি-ধনিপাড়া সড়কে টাংগন নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০০৬ সালে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের জাতীয় সংসদের স্পিকার ব্যারিষ্টার মোহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার জনগনের দুর্ভোগ লাঘবে এই ব্রীজের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করেন। এরপর ক্ষমতার পালাবদলে প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২বছর ও পরে আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকলেও ব্রীজ তো হয়নি বর্তমানে ভিত্তি প্রস্তরেরও সেই ভিত্তিও উধাও। উপজেলা স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরে এ সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘ ১৮বছরেও প্রায় হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি।
শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকলেও বর্ষায় নদীতে পানি বেশি থাকায় প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ ঘুরে দু’পাড়ের বাসিন্দাদের যাতায়াত করতে হয়। একটি ব্রীজ নির্মাণ করা হলে খুব সহজে অল্প সময়ে দুপাড়েরর মানুষ যাতায়াত করতে পারবে। এতে জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে বলছেন সচেতন মহল।
উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, নদীর ওপারে (পূর্বপাশে) রয়েছে মাগুড়া ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্র, দলুয়া হাট, ইউনিয়ন সমাজকল্যান ফেডারেশন, মাগুড়া দারুল উলুম ফারুকিয়া আল ইসলামিয়া মাদরাসা, মাগুড়া প্রধান পাড়া দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া এই লাখেরাজঘুমটি-ধনিপাড়া সড়কের ধনীপাড়া এলাকায় ১নং ওয়ার্ডবাসীর চিকিৎসা সেবার জন্য একমাত্র প্রতিষ্ঠান ধনীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে এলাকার মানুষকে ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নদী পার হয়ে ৭ কিলোমিটার পথ ঘুরে ওপারে যেতে হয়। জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার ব্যারিষ্টার মোহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট এখানে একটি ব্রীজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ব্রীজ তো হয়নি বর্তমানে ভিত্তি প্রস্তরেরও ভিত্তিটুকুও নেই।

সাবেক ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেন বলেন, ২০০৬ সালে লাখেরাজ ঘুমটি এলাকায় একটি ব্রীজ নির্মানের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। ওই সময় আমি ইউপি সদস্য ছিলাম। কিন্তু পরে রাজনৈতিক কারণে আর সেখানে ব্রীজ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ (৬০) বলেন, নদীর পশ্চিম পাশে রয়েছে মাগুড়া ইউনিয়নের হিন্দুপাড়া, নতুনবস্তি, মধ্যপাড়া, সন্তরাপাড়া, ঘুমটি প্রধান পাড়া এবং আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পানবারা, উত্তর পানবারা এবং মালিগাও। এ ছাড়া সদর উপজেলার গরিনাবাড়ি ইউনিয়নের কাশিমপুর, মন্ডলপাড়া, নতুনবস্তি, গোয়ালপাড়া। এসব এলাকার ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে। এখানে ব্রীজ হলে সকলে এর সুফল পাবে। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আমার আবেদন এখানে একটি ব্রীজ নির্মান করা হোক।
সরেজমিনে ওই এলাকায় গেলে কথা হয় লাখেরাজ ঘুমটি গ্রামের মফিদুল ইসলাম (৬২) সাথে। তিনি বলেন, আমার বাড়ির সামনে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। তিনি ভিত্তি ফলকের ভাংগা অংশ বের করে দেখিয়ে বলেন, এটা ভেঙ্গে পড়েছিল। আমি এই ভাংগা অংশ বাড়িতে এনে রেখেছিলাম। তাই এখনো আছে।
কথা হয় গরিনাবাড়ী ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) আব্দুল মান্নানের সাথে। তিনি বলেন, নদীর পূর্বপাশে ধনিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক। সেখানে নিয়মিত আমাকে যেতে হয়। লাখেরাজ ঘুমটি এলাকায় ব্রীজ না হওয়ায় আমাকে অনেকটা রাস্তা ঘুরে ক্লিনিকে যেতে হয়। এখানে ব্রীজ হলে অল্প সময়ে ক্লিনিকে যেতে পারব। তাছাড়া এই এলাকায় ব্রীজটি হলে ১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারাও সহজে ধনিপাড়া ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে পারবে।
মাগুড়া প্রধান পাড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাখেরাজ ঘুমটি গ্রামের নিলুফা জান্নাত বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকলেও বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বেশি থাকায় প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ ঘুরে আমাকে মাগুড়া প্রধান পাড়া স্কুলে যেতে হয়। এখানে একটি ব্রীজ নির্মাণ করা হলে খুব সহজে অল্প সময়ের মধ্যে স্কুলে যেতে পারব।
মাগুড়া প্রধান পাড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাশেম বলেন, লাখেরাজ ঘুমটি-ধনিপাড়া সড়কে টাংগন নদীর উপর লাখেরাজ ঘুমটি এলাকায় একটি ব্রীজ আশু দরকার। নদীর ওপারে অত্র বিদ্যালয়ের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ ঘুরে বিদ্যালয়ে আসে। নদীর উপর ব্রীজ হলে অনায়াসে স্কুলে আসতে পারবে। ছাত্রছাত্রীদের এবং অত্র এলাকার বাসিন্দাদের চলাচলের জন্য ব্রীজটি খুবই প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পঞ্চগড় সদরের উপসহকারী প্রকৌশলী কৃষ্ণ চন্দ্র রায় বলেন, পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের লাখেরাজ ঘুমটি থেকে ধনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়কে টাংগন নদীর উপর সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত অত্র অফিসে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। আমি আপনার মাধ্যমে সেতু নির্মাণ সম্পর্কিত তথ্য জানতে পারলাম। আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করব।
পঞ্চগড় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ জামান বলেন, ওই সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই। বিষয়টি জানলাম। সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image
Share This