কয়লার ময়লাতেই জীবিকা


নিজস্ব প্রতিবেদক
দূর থেকে মনে হচ্ছিল ড্রেনের ময়লা কালো পানিতে কয়কজন মহিলা কী যেন খুঁজছেন; বা মাছ ধরার চেষ্ট করছেন। কাছে যেতেই দেখা যায় তারা ড্রেনের পানিতে কালো সোনা খ্যাত কয়লা খুঁজছেন। অবস্থা এমন যেন ‘যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই,পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন’। এমন দৃশ্যের দেখা মিলে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ময়লাযুক্ত পানি নিষ্কাশনের ড্রেনে কাছে। নিজেদের তৈরি পদ্ধতিতে খনির ভাসমান কয়লার ডাস্ট সংগ্রহ করছেন তারা। খনির ভূ-গর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলন এবং শোধনের পর অবশিষ্ট ময়লা পানি ভূ-পৃষ্ঠে ড্রেনের মাধ্যমে খনির বাইরে অপসারন করা হয়। এই পানিতেই দীর্ঘ সময় ধরে থেকে সামান্য কিছু যে কয়লা পেয়ে থাকেন তারা তা দিয়ে চলে তাদের জীবিকা। এ যেন তাদের জীবন সংগ্রামের একটি অন্য অধ্যায়।
কাছে গিয়ে কথা হয়, জেসমিন, মরিয়ম, রুখসানা খনির পাশের গ্রাম চৌহাটির বাসিন্দা। তারা বলেন, আশেপাশের কয়কটি গ্রামের প্রায় ১২০ জন নারী মিলে সমবায় ভিত্তিক তারা এই কাজ করেন দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে। এই ১২০ জনের মধ্যে ২০/২৫ জন করে মোট আটটি দলে বিভক্ত হয়ে দিনে রাতে পালাক্রমে তারা এই ময়লা পানিতে নেমে ডাষ্ট কয়লা সংগ্রহ করেন। তাদের কথায় প্রতিটি দল সপ্তাহে একদিন করে কয়লা সংগ্রহের সুযোগ পায়। টানা ২৪ ঘণ্টা সময় থাকে কয়লা সংগ্রহের জন্য। এই সময় তারা ওই পানিতে থাকেন। তবে ২৪ ঘন্টায় দুটি দলে ভাগ হয়ে একদল দিনে আর এক দল রাতে কয়লা সংগ্রহ করেন তারা। তারা আরও বলেন খনিতে মাটির নিচ থেকে কয়লা তুললে এবং মেশিন চললে ড্রেন দিয়ে একটু বেশি পরিমাণে কয়লা আসে। কখনো কম কয়লাও আসে। এভাবে ভাগ্য ভাল হলে প্রতিটি দল কোনো দিন ৭/৮ মণ আবার কোনো দিন ১০/১২ মণ কয়লাও পেয়ে থাকেন। সংগ্রহিত কয়লা পরে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেন। এসব কয়লা ইটভাটা চালুর সময় একটু বেশি দামে অর্থাৎ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরেও বিক্রি হয়। এতে করে প্রতিটি দলের সদস্য জনপ্রতি দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পান। দলগত কাজ করায় মাসে তিন দিন কয়লা সংগ্রহ করতে পারেন বলে তারা জানান।
জেসমিন বলেন, যেদিন এই পানিতে নেমে কাজ করি সেই দিন সকালে রান্না করে রেখে বেলা ১১টার দিকে পানিতে নেমে পড়ি। বাড়িতে স্বামী সন্তানরা নিজের মতো খেয়ে নেন। অভাবের কারণে এই পানিতে নেমে কাজ করতে হচ্ছে। তবে দুঃখের বিষয় হলো আমরা কয়লা খনির পাশের গ্রামের লোক হয়েও স্বামী সন্তানরা এই খনিতে চাকরি পায় না। বাইরের লোকজন এখানে চাকরি করছে। খনিতে তো অনেক রকমের কাজ থাকে। আমরা যারা স্থানীয় আছি তাদের কাজ দিলে ভালো হতো।

oppo_0
মনোয়ারা বেগম নামে অপরজন বলেন, এই কালো পানিতে নেমে কয়লা তুলে বিক্রি করে যা টাকা পাই তাতে কোন মতে সংসার চলে। কয়লা খনিতে তো কাজ পাইনি। আমার ছেলে বা নাতির কারও কাজ হয়নি। বাধ্য হয়েই এই কাজ করতে হয়। ভাগ্য ভালো হলে কয়লা একটু বেশি পাই। এমনও হয় কোনদিন কয়লা তেমন পাই না। খালি হাতে ঘুরে যেতে হয়। তিনি বলেন প্রায় ১৬ বছর ধরে খনির এই ড্রেন থেকে কয়লা সংগ্রহ করছি।
খনি সংলগ্ন চৌহাটি গ্রামের মরিয়ম বলেন, নেট সেলাই করে ড্রেনের পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখি। পানির সাথে কয়লার ময়লা ভেসে যাওয়ার সময় সেগুলো নেটে আটকা পড়ে। মাঝে মাঝে বাঁশের মাথায় লোহার তৈরি বিশেষ অস্ত্র দিয়ে ড্রেনের পানিতে থাকা ময়লা কাটি। এভাবে সবাই মিলে দল বেঁধে কাজ করি। যেদিন যেমন কয়লা পাই সেগুলো বিক্রি করে সমানভাবে ভাগ করে নেই।
শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা নেই জীবিকার তাগিতে ময়লা নিষ্কাশনের ড্রেন হলেও তাদের কাছে এটিই জীবিকা নির্বাহে অন্যতম উৎস; ঝড়-বৃষ্টি হিমেল শীতের মধ্যেও তাদের এই ময়লাযুক্ত পানিতে নেমে দিন রাত কালো সোনা খ্যাত কয়লা খুঁজতে হয়। কারণ এটাই যে তাদের পেশা।
