×

ফুলবাড়ীর ছোট যুমনা, তিলাই ও ইছামতি নদীর দুর্দশা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আমরা বলে থকি নদীমাতৃক দেশ হলো বাংলাদেশ। দেশ জুড়েই জালের মতোই ছড়িয়ে আছে নদীগুলো; কিন্তু অনেক নদী আজ হারিয়ে গেছে কিংবা মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। যেন গানের কথায় বলতে হয় ‘আমার একটা নদী ছিল জানল তো কেউ, এই খানে এক নদী ছিল জানল তো কেউ…..’ গানের কথার মতোই দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় কয়টি নদী তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই! উপজেলা পরিষদের ওয়েব সাইটেও নেই কোন নদীর তথ্য! বাংলাদেশ পানি উন্নয় বোর্ড, দিনাজপুরের ওয়েব সাইটে রয়েছে দুটি নদীর কথা; কিন্তু বাস্তবে উপজেলায় নদী তিনটি। এরমধ্যে উপজেলাবাসীর কাছে পরিচিত ছোট যমুনা। আর এলাকা ভিত্তিক আরও দুটি নদী তিলাই ও ইছামতি। নদীগুলো দীর্ঘ দিন থেকে সংস্কার বা খনন না করায় এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। বছরের অধিকাংশ সময় নদীতে পানি পাওয়া যায় না। নদীর দুই ধারের পাড় ক্রমেই দখল হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে নদীর বুক জুড়ে বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চাষ হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য ও সূত্রে জানা যায়, ফুলবাড়ী উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট যমুনা নদীটি জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার বিন্যাকুুড়ি নামক স্থানে ইছামতি নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে পার্বতীপুরের হাবড়া ইউনিয়ন দিয়ে ফুলবাড়ী উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পার্শ্ববর্তী বিরামপুর উপজেলার কাটলা সীমান্ত ঘেঁষে হাকিমপুর উপজেলার হিলি সীমান্ত এলাকায় ঢুকে পড়ে নদীটি। এরপরে আবারও ঢুকে পড়ে ভারতের হিলি সীমান্ত এলাকায়; এরপর কিছু দূর প্রবাহিত হয়ে আবারও বাংলাদেশের জয়পুরহাট জেলার সদর ও পাঁচবিবি উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার ত্রিমোহনী পয়েন্টে যমুনা ও আত্রাই নদীতে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে ছোট যমুনা ফুলবাড়ী উপজেলায় প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়েছে। জেলায় নদীটির দৈর্ঘ ৫৬ কিলোমিটার।

উপজেলার অপর একটি নদী হলো তিলাই। এই নদীটি নীলফামারী জেলায় খড়খড়িয়া নদী হিসেবে পরিচিত হলেও নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলা পেরিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে প্রবেশ করে এই নদী তিলাই নদী নামে পরিচিতি লাভ করে। তিলাই নদী পার্বতীপুরে হাবড়া ইউনিয়ন দিয়ে ফুলবাড়ীর উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নে প্রবেশ করে এই ইউনিয়নের ত্রিমোহনী পয়েন্টে ছোট যমুনার সাথে মিলে যায়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী নীলফামারীর সিঙ্গিমারী বিল থেকে তিলাই নদের উৎপাত্তি। নদীটির দৈর্ঘ্য ৭৫ কিলোমিটার, প্রস্থ ৩০ মিটার এবং গভীরতা ৬ মিটার। নদী অববাহিকার আয়তন ২৬৫ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এই নদকে অনেকেই তিলাই খাল নামে বলেন।

উপজেলার অপর আর একটি নদী হলো ইছামতি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ইছামতী নদীটি জেলার খানসামা উপজেলার ছাতিয়ানগড় বিল থেকে উৎপাত্তি হয়ে চিরিরবন্দরের বিন্যাকুড়ি বাজারে গিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পরিচিতি পেয়েছে একটি ছোট যমুনা, অন্যটি ইছামতী নদী হিসেবে। চিরিরবন্দর উপজেলার পুনট্টি ইউনিয়ন দিয়ে ফুলবাড়ীর এলুয়াড়ী ইউনিয়নে প্রবেশ ইছামতি নদী এবং ফুলবাড়ী পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের ছোট যমুনা নদীতে পতিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য সাড়ে ৭১ কিলোমিটার। বর্তমানে ইছামতি নদীও মরা নদীর আখ্যা পেয়েছে।

এদিকে ফুলবাড়ী উপজেলার সরকারি একটি ওয়েব সাইট আছে, সেখানে উপজেলার বিভিন্ন তথ্য পরিবেশন করা হলেও উপজেলায় কয়টি নদী তার উল্লেখ নেই।

অপরদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয় বোর্ড, দিনাজপুরের ওয়েব সাইটে ফুলবাড়ী উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা ও ইছামতি নদীর কথা উল্লেখ থাকলেও তিলাই নদীর কোন কথা বলা নেই।

একটা সময় এসব নদীর পানি দিয়ে চলতো এই অঞ্চলের কৃষকের চাষাবাদ। নদীর মাছ ধরে জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন জিবিকা নির্বাহ করত; এলাকার মানুষের মাছের চাহিদা পূরণ হতো। বর্তমানে নদীতে পানি না থাকায় এ অঞ্চলে দেশি মাছের অভাব দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ছোট যমুনা প্লাবিত হলেও নদীতে পানি থাকে মাত্র এক মাস। তিলাই নদীর বিভিন্নস্থানে স্লুইস গেট নির্মাণ করায় এতে বেশ কিছুদিন পানি থাকে। আর ইছামতি একদম নালায় পরিণত হয়েছে।

পানিকাটা গ্রামের ৯৪ বছর বয়সি আলহাজ¦ মাও. মো. আবুল হোসেন বলেন ছোট বেলায় তিনি তার বাবা মৃত. বছির উদ্দিনের কাছে শুনেছেন তাদের বাড়ীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত ইছামতি নদী ছিল একসময় খোরস্রোতা। এই নদীতে পাল তোলা নৌকা চলত। তবে বাংলা ১৩০০ সালে এক ভূমিকম্পে নদীর খরস্রোতা হারিয়ে যায়। সেই থেকে এই নদী মৃত। আর কখনো এই নদী খনন করা হয়নি।

ফুলবাড়ী সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের মহদীপুর গ্রামের আবু হানিফ সরকার (৮৫) বলেন, আমার বাড়ীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদী। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি এই নদীর ভয়ংকর রূপ। বর্ষাকালে দুকুল ছাপিয়ে প্লাবিত হতো দু’পাশের গ্রাম মাঠ। ফুলবাড়ীতে বাণিজ্য করতে নওগাঁ থেকে আসত পালতোলা মালবাহি নৌকা। ভাদ্র আশি^ন মাস থেকে সারা বছর চলত মাছ ধরা। আজ সেগুলো কেবলই স্মৃতি। হয়তবা আর দুই দশ বছর পর ছোট যমুনা নদীর নাম নিশানাও থাকবেনা। ছোট যমুনা নদীটি স্থানীয়দের জন্য ছিল আশীর্বাদস্বরূপ। আগে নদী গভীর ছিল, নদীর পানি দিয়ে তীরবর্তী এলাকার জমিতে চাষাবাদ হতো। আবার কেউ কেউ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় নদীর গভীরতা কমে যায়। নদীতে এখন পানি থাকে না বললেই চলে। বর্ষা মৌসুমে কিছু সময় পানি থাকলেও বাকি সময় শুকনা খটখটে। পানি না থাকায় নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে অনেকেই ধানসহ নানা ধরনের চাষাবাদ করছেন।

বাংলাদেশ পানি উন্নয় বোর্ড, দিনাজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ জনান, ফুলবাড়ী উপজেলার ছোট যমুনা নদীসহ অন্য নদী গুলো খননের প্রাথমিক প্রস্তাবনা দেয়া আছে। প্রকল্প পেলে খনন কাজ করা হবে।

মন্তব্য করুন

যে ঘরগুলোতে * চিহ্ন রয়েছে সেগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।