শরীর থেকে মাথা আলাদা করা সেই ছুরি উদ্ধার


পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি
রংপুরের পীরগঞ্জে চাঞ্চল্যকর মায়া-মেয়ে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত সেই চুরি ৫ দিন পর উদ্ধার করেছে থানা পুলিশ।
রিমান্ডের ২য় দিনে গ্রেফতারকৃত একমাত্র আসামী দেলোয়ারার কথিত স্বামী আতিকুরের দেয়া তথ্যে গতকাল মঙ্গলবার চতরা ইউনিয়নের চারমাথা টেংরারদহ নামক স্থানে করতোয়া নদীর জমে থাকা পানি থেকে ওই ছুরি উদ্ধার হয়। এর আগে একই স্থানের পুর্বদিকে করতোয়া নদীর তীর থেকে গত শুক্রবার দেলোয়ারার মাথাবিহীন লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি এম এ ফারুক জানান, মা ও মেয়ে হত্যাকান্ডে জড়িত আতিকুর রহমান মন্ডলকে তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। ঠান্ডা মাথার খুনি আতিকুর স্পষ্ট তথ্য না দিলেও তার স্বীকারোক্তি মুলক তথ্যে খন্ডিত মাথা, মাথা খন্ডনে ব্যবহৃত ছুরি ও শিশু সাইমার লাশ মিলেছে। আতিকুরের জবানবন্দিতে জানা যায়, দেহ থেকে মাথা আলাদা করার পর লাশ কাঁধে উঠানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়। না হলে এই লাশ সে গায়েব করে ফেলতো। শিশু সাইমা অতিরিক্ত দুষ্টামী করতো। দেলোয়ারার সাথে আনন্দ ফুর্তিতে বাধা ছিল সাইমা। তাই দেলোয়ারার অনুপস্থিতিতে তাকে হত্যায় মায়া লাগেনি তার। আতিকুর আরও জানায়, দেলোয়ারা এতো বেশি মাদকাসক্ত ছিল, যার কারণে মাদকের লোভে যে কোন পুরুষে সাথে মেলামেশায় তার রুচিতে আটকাতো না। এ কারণে রাগান্বিত ছিল আতিকুর। হত্যার দিন দেলোয়ারাকে নেশার ছলে মরিচ ক্ষেতে নিয়ে অতিরিক্ত নেশা করিয়ে হত্যা করা হয়। ব্যবহৃত ছুরিটি উন্নত মানের লোহা দিয়ে ধারালোভাবে বানানো। এতে আরও অনেকের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে জানান ওসি এম এ ফারুক।
উল্লেখ্য, রংপুরের পীরগঞ্জে গত শুক্রবার দেলোয়ারা নামের এক নারীর মাথাবিহীন লাশ, পরদিন মাথা উদ্ধার এবং তারও একদিন পর তাঁর গত রবিবার মেয়ে সাইমার লাশ পাওয়া যায়।
গত শুক্রবার বড় বদনাপাড়ায় এক নারী মরিচ তুলতে ক্ষেতে গিয়ে নারীর মাথাবিহীন লাশ পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার দেন। এ সময় স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে এসে পুলিশকে খবর দেন। সিআইডির ক্রাইম সিন দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় ও ঠিকানা শনাক্ত করে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দেলোয়ারার কথিত স্বামী বড় বদনাপাড়া গ্রামের আতিকুর রহমান মন্ডল ও তার মা আপিয়া বেগমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এসআই অনন্ত কুমার বর্মণ বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। গত রোববার সাইমার লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চলে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা আতিকুরের বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
মামলার বাদী পীরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অনন্ত কুমার বর্মণ জানান, দেলোয়ারা যাত্রায় নাচের জন্য ঝিনুক মালা নাম নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যাত্রাদলের সঙ্গে থাকতেন। ছোটবেলায় তাঁর বাবা-মা মারা যান, ভাই-বোনও ছিলেন না। মামা-মামি তাঁকে বড় করেন। ১২-১৩ বছর বয়সে পালিয়ে গিয়ে যাত্রা দলে যোগ দেন তিনি। পরে বাড়ি ফিরলেও মামা-মামি তাঁকে আর গ্রহণ করেননি। রেজাউল করিম যাত্রা প্যান্ডেলে জুয়ার গুটিচালক (ডাবু) ছিলেন। সেখানে তাদের পরিচয়ের পর বিয়ে হয়। দেলোয়ারা তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। আতিকুর রহমানও একই ধরনের কাজ করতেন। যাত্রায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয় দেলোয়ারার। পরিচয়ের পর তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে চলাফেরা করায় রেজাউল স্ত্রীকে তালাক দেন। এরপর থেকে আতিকুরের বাড়িতে থাকতেন দেলোয়ারা। ৪৫ দিন আগে দুষ্টুমি করায় শিশুটিকে আতিকুর আঘাত করেন। এতে সে চেতনা হারিয়ে ফেলে। পরে তাকে হত্যা করে মাটিতে পুতে রাখে। ঘটনার সময় শিশুটির মা বাড়িতে ছিলেন না। যাত্রা থেকে ১৫-২০ দিন পর ফিরে দেলোয়ারা সন্তানের খোঁজ করলে আতিকুর বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। এর জেরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ ধারণা করছে।
