
দেশ মা প্রতিবেদন
ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা আগামীকাল সোমবার। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব এই ঈদ। এ দিন দিনাজপুরসহ সারা দেশে পশু কোরবানি দেবেন সামর্থ্যবান মুসলমানরা। এর মাধ্যমে পরম করুণাময়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করবেন তারা। একইসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামীনের নির্দেশনা মেনে দরিদ্র ও কোরবানি করতে অক্ষম লোকদের মাঝে জবাইকৃত পশুর মাংস বিলি করে সৃষ্টি করবেন সমতা ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত। এর আগে ঈদের নামাজে ধনী- গরিব সবাই এক কাতারে শামিল হয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য কামনা করবেন।
'আজহা' অর্থ কোরবানি বা উৎসর্গ করা। ঈদের উৎসবের সাথে মিশে আছে চরম ত্যাগ ও প্রভু প্রেমের পরাকাষ্ঠা। প্রতিবছর চন্দ্র মাসের ১০ জিলহজ পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয় ঈদুল আজহা। অবশ্য ১০, ১১ ও ১২ তারিখের যে কোনো এক দিন কোরবানি করা যায়। কোরবানিকৃত পশুর তিন ভাগের এক ভাগ গরিব-মিসকিন, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের মধ্যে মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার বিধান আছে। আবার পুরোটাও বিলিয়ে দেওয়া যায়।
মহান আল্লাহর জন্য নিজের জান-মালও প্রিয়তম জিনিস সন্তুষ্টচিত্তে বিলিয়ে দেয়ার দিন পবিত্র ঈদুল আজহা। সামর্থবান মুসলমানদের জন্য কোরবানী করা ওয়াজিব। আল কোরআনের সূরা কাউসারে বলা হয়েছে, 'অতএব তোমার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কোরবানী কর।' সূরা হজে বলা হয়েছে, 'কোরবানী করা পশু মানুষের জন্য কল্যাণের নির্দেশনা।' কোরবানীর ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। সৃষ্টির প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) এর দু'পুত্র হাবিল ও কাবিল সর্বপ্রথম কোরবানী করেন। এ প্রসঙ্গে সূরা মায়েদায় ২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে, 'আপনি তাদের আদমের দু'পুত্রের বাস্তব অবস্থা পড়ে শোনান। যখন তারা উভয়েই কিছু কোরবানী করেছিল তখন তাদের একজনের কোরবানী কবুল হয়েছিল এবং অপরজনেরটি হয়নি।' কোরবানী মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নাহ। আল্লাহ তার কুদরতী পরিকল্পনায় ইব্রাহীমকে (আ.) তার শেষ বয়সে প্রিয়তম পুত্র ইসমাঈলকে (আ.) কোরবানী করার নির্দেশ দেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.) ৮৫ বছর বয়সে হযরত ইসমাইলকে (আ.) পান। এ অবস্থায় ছেলেকে কোরবানী দেয়া এক কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু তিনি তার মহান রবের হুকুমে নত হলেন। নিষ্পাপ পুত্র ইসমাঈল (আ.) ও নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। একপর্যায়ে পিতা তার পুত্রকে জবাই করতে যখন উদ্যত ঠিক তখনই মহান আল্লাহর কাছে ঈমানের কঠিন পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন। চোখ বাঁধা অবস্থায় তিনি জবাই করেন। চোখ খুলে দেখেন তার প্রিয় পুত্র অক্ষত রয়েছে আর কোরবানী হয়েছে একটি চতুষ্পদী দুম্বা। পবিত্র আল কোরআনে এই মহিমান্বিত ত্যাগের ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়েছে, 'অতঃপর সে (ইসমাঈল) যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো তখন ইব্রাহীম (আ.) তাকে বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্ন দেখেছি তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কি? সে বললো, হে পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইব্রাহীম (আ.) তাকে জবাই করার জন্য শায়িত করলেন তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবেই সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু।' হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর অনুপম ত্যাগের অনুসরণে হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্ব মুসলমানরা কোরবানী করে আসছে। তারই নিদর্শন স্বরূপ প্রতি বছর হজ পালনকারীরাও কোরবানী দিয়ে থাকেন। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোরবানীর পূর্বশর্ত আল্লাহভীতি ও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্খা। হাদীস শরীফে আছে, 'মানুষের আমলের প্রতিফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সূরা হজে বলা হয়েছে, 'এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে যায়।' প্রত্যেক আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানী করা ওয়াজিব। রাসূল (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানী দিল না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে।'