

নিজস্ব প্রতিবেদক
কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারো দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে বাস্তবে বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে নামমাত্র মূল্যে কোরবানির বিক্রি হচ্ছে পশুর চামড়া। এখানে গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। একটি ছাগলের চামড়া বিক্রি হচ্ছে এক কাপ চায়ের দামে অর্থাৎ মাত্র ৫-১০ টাকায়। অনেকে ছাগলের চামড়ার দাম না পেয়ে নদীতে ফেলছেন।
ঈদের দ্বিতীয় দিন আজ শুক্রবার ফুলবাড়ী পৌর শহরের নিমতলা মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে চামড়া বেচাকেনা করতে ভিড় করছে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজন। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন ক্রেতারা। সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কতৃক কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়ার নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী: ঢাকায় গরুর চামড়া: প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৬০-৬৫ টাকা । ঢাকার বাইরে গরুর চামড়া: প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫-৬০ টাকা। খাসির চামড়া: সারা দেশে প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতি বর্গফুট চামড়ার মাপ অনুযায়ী একটি মাঝারি গরুর চামড়া সাধারণত ১৩০০ থেকে ১৮৫০ টাকা এবং বড় চামড়া ২০০০ থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা। তবে, প্রতি বছরের মতো এবারও মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কোরবানি দাতারা সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরকার নির্ধারিত এই দাম পাচ্ছে না দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার কোরবানি দাতা মুসল্লিরা। ফলে চামড়ার বাজার মুখ থুবড়ে পড়েছে।
প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করে থাকে বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানা। অনেক কোরবানিদাতাই স্বেচ্ছায় তাদের পশুর চামড়া এসব প্রতিষ্ঠানে দান করেন। এই চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অন্যান্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। তবে কয়েক বছর ধরেই চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে। দাম কম থাকায় তাদের মধ্যে হতাশা লক্ষ করা গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি থেকে যে দর নির্ধারণ করা হয়, তার ভিত্তিতেই তারা মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনাবেচা করেন। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েন কোরবানিদাতা ব্যক্তি, মসজিদ-মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো।
সরকার নির্ধারিত দামের প্রসঙ্গে তারা বলছেন, সরকার যে নির্ধারিত দাম দিয়েছে এটা লবণযুক্ত চামড়ার দাম। গতবারের তুলনায় এবার লবণের বস্তায় দুই থেকে আড়াইশ টাকা বাড়তি। লবণ দেওয়া থেকে শুরু করে কেরিং, ওঠানামা-সব মিলিয়ে একটি গরুর চামড়ায় ২০০-৩০০ টাকা খরচ পড়ে যায়।
চামড়া বিক্রি করতে সুলতান নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও এই দাম শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। চামড়ার বাজার আগেও যা ছিল এবারও তা-ই আছে। একটি গরুর চামড়া আর একটি ছাগলের চামড়া এনেছিলাম। গরুর চামড়া বিক্রি করলেও ছাগলের চামড়ার দাম নেই, তাই ফেলে দিয়েছি। দেলওয়ার হোসেন নামে আরও এক কুরবানীদাতা বলেন, একটি ছাগলের চামড়া এনেছিলাম, দাম না থাকায় ফেলে দিয়েছি। তিনি বলেন, এক সময় আমাদের দেশের চামড়া দেশের বাহিরে রফতানি হত , দামও ভালো পাওয়া যেত। অথচ এই শিল্পটি ধংস হতে চলেছে।
স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী কোরবান আলী ট্যানারির মালিকদের দোষারোপ করে বলেন, ‘তারা সরকারি দামে না কেনায় আমরাও কিনতে পারছি না। আমরা আকার ভেদে ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় চামড়া কিনছি। ট্যানারির মালিকেরা ছাগলের চামড়া নিতে চায় না। তবুও ছাগলের চামড়া নিচ্ছি ৫-১০ টাকায়। অন্য দিকে কোরবানি উপলক্ষে বেড়েছে লবণের দাম। তিনি আরও জানান, গত বছর সরকারি দামে চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছিলেন। অনেক চামড়া নদীতে ফেলে দিতে হয়েছে। তাই এবার মাত্র ১০০ গরুর চামড়া কিনেছেন। তিনি আরও জানান, যে পরিমাণ পশু কোরবানি হয়, তা দেশের ট্যানারিগুলোর ধারণক্ষমতার অনেক বেশি। তাই তারা ন্যায্য মূল্যে চামড়া কিনতে চায় না। সরকারের উচিত চামড়া রফতানির বিষয়ে চিন্তা করা।