

আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
বর্ষার এক দুপুরে তুলসীগঙ্গা নদীর ঘাটে কয়েকজন অভিভাবক ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ হাত ধরে পানিতে নামাচ্ছেন, কেউ আবার নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত চোখে সন্তানকে আঁকড়ে রেখেছেন। নদীর বুকেই এখন শেখানো হচ্ছে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা-সাঁতার। অথচ কয়েক বছর আগেও এই দৃশ্য ছিল গ্রামের পুকুরে।
সরেজমিনে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার পৌর শহর, তিলকপুর, রায়কালী, সোনামুখী, গোপীনাথপুর ও বিহারপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ৪ হাজারের বেশি ছোট-বড় পুকুর রয়েছে। কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে পুকুরের প্রাচুর্য থাকলেও নিরাপদভাবে শিশুদের সাঁতার শেখানোর উপযোগী পুকুর দিন দিন কমে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পুকুর বর্তমানে বাণিজ্যিক মাছ চাষের আওতায়। এসব পুকুরের অনেকগুলোর পানি পরিষ্কার থাকলেও মাছের ক্ষতির আশঙ্কায় মালিকেরা শিশুদের নামতে দিতে চান না। অন্যদিকে প্রায় ২০ শতাংশ পুকুর দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় কচুরিপানা, আগাছা, কাদা, ভাঙা পাড় ও অসমান তলদেশের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
তিলকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আগে আমাদের গ্রামের কয়েকটি পুকুরে নিয়মিত ছেলে-মেয়েরা সাঁতার শিখত। এখন প্রায় সব পুকুরই মাছ চাষের জন্য ব্যবহার হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার নদীতে যাচ্ছে।
পুকুরের বিকল্প হিসেবে এখন অনেক পরিবার ভরসা করছে তুলসীগঙ্গা নদীকে। কিন্তু নদী কখনোই নতুন সাঁতারুদের জন্য নিরাপদ নয়। বর্ষাকালে কোথাও হঠাৎ গভীর পানি, কোথাও তীব্র স্রোত, আবার কোথাও বালু সরে তৈরি হওয়া গর্ত মুহূর্তেই দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
পৌরসভার বাসিন্দা ছোটনা বলেন, ছেলে-মেয়েকে সাঁতার শেখাতে কয়েকবার নদীতে নিয়ে গেছি। কিন্তু নদীর স্রোত দেখে ভয় লাগে। পুকুরে শেখানোর জায়গা থাকলে কখনো নদীতে যেতাম না।
শুধু আশঙ্কা নয়, বাস্তবেও ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। আক্কেলপুর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে উপজেলায় অন্তত চারজন শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ঠেংগাপুর গ্রামের বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আহমেদ এখনও ভুলতে পারেন না তাঁর একমাত্র পুত্র আব্দুল্লা আল মামুনকে। তিনি বলেন, ৩ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে তুলশী গঙ্গা নদীতে ডুবে আমার ছেলের মৃত্যু হয়। এই কষ্ট কোনো বাবা-মায়ের জীবনে না আসুক। প্রতিটি উপজেলায় নিরাপদ সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা দরকার।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আক্কেলপুর উপজেলায় শিশুদের জন্য কোনো স্থায়ী সরকারি নিরাপদ সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। বিদ্যালয়গুলোতেও নিয়মিত সাঁতার শেখানোর কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বছরে একবার-দুবার প্রতিযোগিতা হলেও তা প্রশিক্ষণের বিকল্প নয়।
উপজেলার আক্কেলপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ.ফ.ম রায়হান আলী জানান, সাঁতার শুধু একটি খেলাধুলা নয়, এটি জীবন রক্ষাকারী দক্ষতা। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরকারি কর্মসূচির অভাবে শিশুরা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে পুকুর মালিকদেরও রয়েছে নিজস্ব বাস্তবতা। পৌরসভার রূপনগর মাছ চাষি সোহেল বলেন, একটি পুকুরে কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকে। শিশুদের সাঁতার কাটতে দিলে মাছের ক্ষতির আশঙ্কার পাশাপাশি কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায়ও পুকুর মালিকের ওপর এসে পড়ে। তাই অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই শিশুদের পুকুরে নামতে দিতে চান না।
আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীন রেজা বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে চারজন শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর তথ্য আমাদের নথিতে রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিভাবকের অগোচরে শিশুরা জলাশয়ের কাছে চলে যায় এবং সাঁতার না জানার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে।
আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক-উর-রহমান বলেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক। নিরাপদ সাঁতার প্রশিক্ষণ চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি জানান, উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১৪ ও ২১ দিন মেয়াদি কয়েকটি সাঁতার প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন মিললে বেশ কয়েকটি কোর্স পরিচালনা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও গ্রাম পুলিশদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। তিনি বিদ্যালয়ভিত্তিক সাঁতার শিক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।