

পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি
রংপুরের পীরগঞ্জে পাঁচগাছি ইউনিয়নে বিশ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে একতা বাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৫ শতাধিক পরিবার, ১০ সহস্রাধিক মানুষ পানি বন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েন।
প্রতি বছর ওই ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরাবাদ, সিট জাহাঙ্গীরাবাদ, পাঁছগাছি, বিরাহিমপুর, মোজাফ্ফরপুর, আমোদপুর, সাহাপুর, নাইয়ার বাজার, একতার বাজার ও নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দারা দুর্ভোগে পড়লেও সরকারিভাবে দুর্ভোগ লাঘবে আজও কোন যথাযথ পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। এছাড়াও ওই এলাকার ১২‘শ একর ফসলি জমির ফসল প্রতি মওসুমে নষ্ট হচ্ছে। এলাকার বিভিন্ন যায়গায় কালভার্ট ও পাইপ লাইনের মুখে বসতবাড়ি এবং দোকানঘর নির্মাণ করায় কয়েকটি গ্রামের শত শত পরিবার পানিবন্দিসহ হাজার হাজার মানুষকে জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে ক্ষেতের ফসল নষ্টসহ মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে পাঁছগাছি ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরাবাদ থেকে একতার বাজার, একতার বাজার থেকে পাশ্র্বর্তী সাদুল্লাহপুর উপজেলার ছান্দিয়াপুর, একতার বাজার থেকে মিঠাপুকুর উপজেলার পদ্মহার পর্যন্ত সড়ক নির্মিত হয়। তিনটি সড়কের মেলবন্ধন তিন মাথায় ”একতার বাজার” গড়ে উঠে। এদিকে একতার বাজার থেকে মাঠের বাজার হয়ে পাঁছগাছি দিয়ে আরেকটি সড়ক আবারও একতার বাজারে মিলিত হয়। ফলে একাতার বাজারে গড়ে উঠে নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডার গার্টেন। ছান্দিয়াপুর থেকে পদ্মহার ভায়া একতার বাজার ও মাঠের বাজার সড়কে গুরুত্বপুর্ণ ৩টি কালভার্ট ও একটি পানি নিস্কাশনের জন্য পাইপ লাইন দিয়ে ভেলামারি বিল ও বামনীর বিলের অতিরিক্ত পানি নিস্কাশন হতো। পাঁচগাছি উত্তর পাড়ার সাগর চৌকিদার পাইপ লাইনের মুখ বন্ধ করে বসতবাড়ি গড়ে তুলেন। একই গ্রামের মধ্যপাড়ায় পিন্টু মন্ডলের বাড়ির পাশের কালভার্টের মুখ বন্ধ করে বসতবাড়ি গড়ে উঠে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরাবাদের মধু মেম্বারের বাড়ির পাশের কালভার্টের মুখ বন্ধ করে বসতবাড়ি ও একাতার বাজারের কালভার্টে মুখ বন্ধ করে দোকান নির্মাণ করা হয়। ফলে ছান্দিয়াপুর থেকে পদ্মহার ভায়া একতার বাজার সড়কের পুর্বদিকে ভেলামারির বিলের পানি ও পশ্চিমদিকে বামনির বিলের পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এই দুই বিলের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মওসুমে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে জলাবদ্ধতায় ৮টি গ্রামের ১০ সহস্রাধিক মানুষ দুর্ভোগে পড়েন এবং আবাদি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষাকাল এলেই গ্রামের রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। একতার বাজার নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আল হেরা কিন্ডার গার্র্টেন স্কুলের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। হাটু সমান পানি বিদ্যালয়ের মাঠে। কৃষকরা আমন ধানসহ বিভিন্ন রবি শস্য আবাদ করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেক পরিবারের বসতঘরেও পানি ঢুকে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
স্থানীয় বাসিন্দা ছবিজল মিয়া বলেন, প্রতি বছর বর্ষা এলেই আমাদের বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। ছোট ছোট শিশুদের স্কুলে পাঠানো যায় না। দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট করছি, কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। কার্লভাটের সামনে বসতবাড়ি থাকায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।
আরেক বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে কৃষিজমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। বছরের পর বছর একই সমস্যা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। শুধু ইরি ধান ছাড়া আমন চাষ করা যায় না।
পাঁচগাছি গ্রামের কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চললেও অতীতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ।
ইউপি সদস্য সাদা মিয়া বলেন, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান চান তারা। দ্রুত কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল পুনঃখনন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন সরকারের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
জাহাঙ্গীরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে এই সমস্যা, রাজনীতিবীদরা সব সময় এই দুভোর্গের আলোচনা ও সমাধানে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের সিম্প্যাথি নিয়েছেন। ভোট এলেই নানা প্রতিশ্র্রুতি থাকলেও দুর্ভোগ লাঘবে বাস্তবমুখী কোন পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমন আহম্মেদ জানান, জলাবদ্ধতার শিকার ওই এলাকার প্রায় ১২’শ একর জমিতে প্রতি মওসুমে ৮ কোটি টাকার ধান উৎপাদন সম্ভব। যা প্রায় সময়ই বৈরি আবহাওয়াসহ জলাবদ্ধতায় ব্যহত হচ্ছে, কৃষকরা দিনের পর দিন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ব্যক্তি মালিকানা জমিতে যদি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে, সেখানে বসতবাড়ি ও দোকান নির্মাণ হবার কথা নয়। কালভার্ট বা পাইপ লাইন বদ্ধ করে বসতবাড়ি/দোকান নির্মাণে শুরুতেই প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। শ্রেণী পরিবর্তন করে প্রায় ১২/১৫ বছর ধরে বসতবাড়ি/দোকান গড়ে উঠেছে। প্রকৌশল অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের টিম সরেজমিনে পরিদর্শনসহ পরিকল্পনা গ্রহন করে এ সমস্যা সমাধান করতে হবে। নয়ত সরকারি অর্থ অপচয় হবে কিন্তু সাফল্য আসবে না।
রংপুর জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম জানান, এ বিষয়টি আমি জেনেছি। জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।