

বোচাগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
দিনাজপুরে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা গত ৩২ দিনে ২৯ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন। এরমধ্যে ৪ জন গোখরা সাপে কাটা রোগী ছিল। যাদের চিকিৎসা দেয়া ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জিং। চিকিৎসকদের একের এর এক সাফল্যের কারণে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্টি এই অঞ্চলের সাপে কাটা রোগীদের ভরসার হাসাপাতালে পরিণত হয়েছে। আর এ কাজে হাসপাতালটিতে উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে এন্টিভেনম সরবরাহ দিয়ে সহায়তা করছেন বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মারুফ হাসান।
জানা যায়, চারজন আশংকাজনক রোগীর মধ্যে গত বুধবার (৫আগষ্ট) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বোচাগঞ্জ উপজেলার ইজিবাইক চালক তরিকুল ইসলামের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার (১৮)। এর আগে গত ২৫ জুলাই ভর্তি হয়েছিলেন বোচাগঞ্জ উপজেলার দফচাই গ্রামের সাদেকুল ইসলাম (২১), ১০জুলাই ভর্তি হয়েছিলেন জালগাঁও গ্রামের সুজন চন্দ্র রায়(২৭) ও গত ৪ জুলাই ভর্তি হয়েছিলেন কাহারোল উপজেলার তারগাঁও গ্রামের প্রকৃত চন্দ্র রায়(৪৩)।
বোচাগঞ্জ উপজেলার ইজিবাইক চালক তরিকুল ইসলামের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার (১৭) বুধবার বিকালে বাড়ীর আঙ্গীনায় কুকুর-বিড়ালের মারামারি ছুটিয়ে বারান্দায় উঠছিলেন। এ সময় তাকে একটি সাপ কামড় দেয়। এতে তিনি যন্ত্রনায় চিৎকার করতে শুরু করে। তার চিৎকারে স্বামী তরিকুল ইসলাম দ্রুত তাকে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ েনিয়ে যান। সেখানে ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আবদুল্লাহ ইবনে এনামসহ চিকিৎসকরা দংশনস্থানে বাইট মার্ক শনাক্ত করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন। পরবর্তীতে বিষক্রিয়ার নিউরোলজিক্যাল লক্ষণ প্রকাশ পেলে চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী দ্রুত রোগীকে এন্টিভেনম প্রয়োগ করে। সময়মতো চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই হাসাপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সর্পদংশন রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সর্পদংশনের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ এন্টিভেনম মজুত রয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদান অব্যাহত আছে।
আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা .মো. আবদুল্লাহ ইবনে এনাম বলেন, সীমাবদ্ধ সম্পদের মাঝেও সঠিক সিদ্ধান্ত আর মজবুত টিমওর্য়ার্কের কাছে হার মানল আরও একটি বিষধর সাপের কামড়। তিনি বলেন, পর পর তিনটি সফল যুদ্ধের পর, বুধবার বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ েআমরা যুক্ত করলাম আরও এক প্রাণ বাঁচানোর গল্প, আমাদের চতুর্থ সাফল্য অর্জন করলাম।
তিনি বলেন, সাপ না চিনলেও বা না দেখতে পেলেও সময় নষ্ট না করে সরাসরি হাসপাতালে চলে আসাই ছিল আজ এই রোগীর প্রাণ বাঁচানোর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। প্রতিটি নতুন প্রাণ বেঁচে যাওয়ার পর রোগীর স্বজনদের মুখের স্বস্তির হাসি আমাদের কাজের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়। তিনি বলেন, এই উপজেলায় আমরা ৪ জুলাই থেকে বুধবার ৫ আগষ্ট পর্যন্ত মোট ২৯ জন সাপে কাটা রোগী পেয়েছি। যার মধ্যে ৪ জন ছিল বিষধর গোখরা সাপে কাটা রোগী। তাদেরকে আমরা হাসাপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছি।
বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বিজয় কুমার রায় বলেন, বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ কর্তৃপক্ষ সাপের কামড়ের ঘটনায় ঝাড়ফুঁক, কুসংস্কার বা চিকিৎসায় বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে আসার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কারণ, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী এন্টিভেনম প্রয়োগের মাধ্যমে অধিকাংশ সর্পদংশনের রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মারুফ হাসান বলেন, উপজেলায় সাপের কামড়ের রোগী বেড়েছে। অনেক মানুষ রয়েছে যারা সাপে কামড়ানোর পর হাসপাতালে আসলেও অর্থের অভাবে এন্টিভেনম কিনতে পারেন না। অনেক সময় আবার উপজেলা পর্যাযে টাকা থাকলেও ফার্মেসি গুলোতে এন্টিভেনম পাওয়া যায়না। আবার এন্টিভেনমের অভাবে সঠিক সময় চিকিৎসা শুরু করা যায়না। অনেক সময় জেলা শহরে হাসাপাতালে দেরিতে পৌঁছানোর কারণে চিকিৎসা সঠিক সময় শুরু হয়না। তাই উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে হাসপাতালে এন্টিভেনম সরবরাহ করা হয়। এতে করে মানুষের যেমন উপকার হয়, তেমনি চিকিৎসক নার্সরাও উৎসাহিত হয়। আর এতে করে বেঁচে যায় সাপে কাটা রোগীদের প্রাণ। হাসপাতালে বলা আছে যখনি এন্টিভেনম মজুদ কমে আসবে। আমাকে বলা মাত্রই আমরা সাথে সাথে নতুন এন্টিভেনম সরবাহ করে দিবো। সাপে কাঁটা রোগীদের ঝাঁড়, ফুক না করে দ্রুত হাসাপাতালে আসার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।