

নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা এখনো অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার। প্রশিক্ষণ, কাজের সুযোগ এবং ন্যায্য মজুরি না পাওয়ায় অনেক নারী নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে না। সংসারে কাজের পাশাপাশি বাড়তি কিছু করার ইচ্ছা থাকলেও সুযোগের অভাবে থেমে যায় তাদের স্বপ্ন। তবে সেই বাস্তবতা বদলে দিতে কাজ করছে দিনাজপুরে নবাবগঞ্জ উপজেলা গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের নারী উদ্যোক্তা আরজুমান আরা।
তাঁর উদ্যোগে নারীদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন নানা ধরনের টুপি। আর এসব টুপি রপ্তানি হচ্ছে সৌদি আরব, ওমান, পাকিস্তান, আরব আমিরাত, কুয়েত, কেনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
কথায় আছে, পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই চরণ যেন বাস্তবে রূপ দিয়েছে নারী উদ্যোক্তা আরজুমান আরা। নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন থেকে তার এই উদ্যোগ।
একজন নারী হিসেবে, নারীদের অসহায়ত্ব ও সংগ্রামের বিষয়টি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছেন এই নারী উদ্যোক্তা। বিশেষ করে গ্রামের অনেক নারী সংসারের কাজ ফাঁকে ফাঁকে নিজে কিছু করতে চান। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ না থাকায় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবার যারা কাজ জানেন, কিন্তু কাজের জায়গা খুঁজে পান না। এসব বিষয়ে চিন্তা করে তিনি তার নিজ বাড়িতে নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন টুপি তৈরির কাজ।
বর্তমানে আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের নারীরা টুপি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রতিনিয়ত বাড়ছে নারীদের কাজের আগ্রহ। এক সময় যারা মোবাইল, ইন্টারনেট, আড্ডায়,গুজবে সময় কাটাতেন। আজ সেই নারীরা অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে বাড়িতে বসেই তৈরি করছেন নানা ধরনের টুপি, আয় করছেন বাড়তি টাকা। এতে একদিকে যেমন নারীদের কর্মসংস্থান হয়েছে,অন্যদিকে বাড়তি আয়ে স্বচ্ছলতা ফিরছে অনেক পরিবারে।

৬৫ বছর বয়সে নয়াপাড়া গ্রামের লাইলি বেগম বলেন, এক সময় আমি হাতের কাজ করতাম । এখন বৌমার এখানে টুপি তৈরির কাজ করছি। এলাকায় এ ধরনের কাজ করতে পেরে আমার অনেক উপকার হয়েছে। এই বয়সে এসেও যে নিজে কিছু করতে পারছি, আমার অনেক ভালো লাগছে।
মিনু,নিপা , স্বপ্না, তাসলিমা, সুইটি সাথে সরজমিনে গিয়ে কথা হলে তারা জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসর সময়ে টুপি তৈরি করি। মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছি। এতে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ,সহ নিজেদের প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারছি। স্বামীর কাছে আর টাকা চাইতে হচ্ছে না। আগে মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেটে, গল্প আড্ডায় সময় কাটাতাম। আর এখন আরজু আপা উদ্যোগে সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে কিছু করতে পেরে আমাদের অনেক ভালো হয়েছে ।
আল রাঈন এগ্রো লিমিটেডে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নারী উদ্যোক্তা আরজুমান আরা বলেন, দেশের অনেক নারী এখনো অবহেলিত। একজন নারী হিসেবে আমি তাদের কষ্ট ও অসহায়ত্ব বুঝি। নারীরা সংসারের কাজের ফাঁকে যেনো কিছু করতে পারে। সেই ভাবনা থেকে নারীদের স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করি। আমার লক্ষ্য শুধু টুপি তৈরি বা ব্যবসা করা নয়, গ্রামের নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। বর্তমানে ১০০ জন নারী কাজ করছে এখানে তারা প্রতি টুপি ২৭ টাকা পাচ্ছে। ইতি মধ্যে ১০ হাজার নামাজি টুপি ও ৫০০ কটি কেনিয়া রপ্তানি হয়েছে ও আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচে রপ্তানি অর্ডার কাজ চলমান। আগামীতে আরো নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই। তবে যদি অল্প সুদে ঋণ পাওয়া যায়,তাহলে ব্যবসা পরিধি বাড়াতে পারতাম সাথে নারীদের কর্মসংস্থানের আরো সুযোগ সৃষ্টি হত।
নবাবগঞ্জ সমাজসেবা কর্মকর্তা শুশ্র প্রকাশ চক্রবর্তী বলেন ,নারীরাও যে সুযোগ পেলে নিজেদের দক্ষতা, শ্রম দিয়ে পরিবার, সমাজের ও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন, তার একটি উদাহরণ নবাবগঞ্জ উপজেলা নারী উদ্যোক্তা আরজুমান আরা। নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আমরা কাজ করে আসছি। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ক্ষুদ্র ঋণসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা তাকে দেওয়া হবে।
