

নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের ভূমি অফিস গুলোতে দিনের পর দিন চলছে অজ্ঞত ব্যক্তিদের অবাধ বিচরণ। এমনকি সরকারি কর্মচারীদের উপস্থিতির আগেই হাজির হন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এই ব্যক্তিরা। তাদেরকে দেখে বোঝার উপায় নেই আদৌ তারা অফিসের লোক নাকি বহিরাগত। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন- তারা কি সরকারি কর্মচারী নাকি প্রভাবশালী দালাল?
স্থানীয় ও সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীরা বলেন, অফিসে কোন কাজে আসলে আগে তাদের সাথে কথা বলতে হয়। ফাইলপত্র থেকে শুরু করে সবকাজে তাদেরকে দেখা যায়। আমরা মনে করছি, অফিসের স্টাফ। অফিসার আসার আগে তাকে অফিসে দেখা যায়। তারা আরো বলেন, জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা পেতে গেলে অনেক সময় তাদের মাধ্যমেই যোগাযোগ করতে হয়। তাদের সাথে যোগাযোগ না করলে ফাইলের গতি ধীর হয়ে যায়। আমরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছি এইসব দালালদের কাছে।
সরেজমিনে উপজেলার ভাদুরিয়া ও বিনোদনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে দালালদের দৌরাত্মের প্রমাণ পাওয়া যায়। ভূমি অফিস দুটিতে দালালদের কর্মকর্তাদের সাথেই কাজ করতে দেখা যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা দালালদের মাধ্যমেই অতিরিক্ত টাকা লেনদেন করেন বলে অভিযোগ করেন সেবা গ্রহীতারা।
ভাদুরিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে শাল্টি মুরাদপুরের শফিকুল ইসলাম বলেন, ভাদুরিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দালাল না ধরলে কোন কাজ হয়না। লোকবলের অভাবের কথা বলে কর্মকর্তারা তাদেরকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। চাকরি করেন না বলে তারা কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামত টাকা পয়সা আদায় করেন। এখানে দালাল জাহিদুল ইসলাম কোন চাকরি না করেও গোপন নথিপত্রের কাজ করেন। ৪ শতক জমি খারিজের জন্য তাকে ২৮ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি। এভাবে আমরা গরিব মানুষ প্রতিনিয়তই তাদের কাছে জিম্মি হয়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ভাদুরিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দালাল জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নই। আমি স্যারের ড্রাইভার। স্যারের অনুমতি নিয়েই ফাইলপত্রে হাত দেই। স্যারকে মাঝে মাঝে কিছু কাগজপত্র এগিয়ে দেই। অফিসে বসে অনলাইনে খারিজের আবেদন করতে সহায়তা করি এজন্য ৫০০ টাকা নেওয়া নিই। ৪ শতক জমির খারিজে ২৮ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে বলেন, অনেক সময় সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যাশার কারণেও বাড়তি ব্যয় হয় ও এসিল্যান্ড অফিসে গেলে তাদেরও কিছু চাহিদা থাকে সেটাও দিতে হয়।
ভাদুরিয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খারিজ করতে প্রায় ১ হাজার ১৭০ টাকা খরচ হয়, এর বাইরে কোনো নির্ধারিত ফি নেই। ৪ শতক জমি খারিজ করতে ২৮ হাজার টাকার অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, আমরা লোকবল সংকটে আছি। অনেক সময় বাধ্য হয়ে অন্যের সহায়তা নিতে হয়।
এদিকে বিনোদনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তার ভঙ্গিতে সঞ্জিত নামের একজন রয়েছেন। তিনি বিরামপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা। বিনোদনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কি দায়িত্বে আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তো আর নাই, তাই আর আসি না। আমি এই অফিসের কেউ না। ফাইলপত্র অফিসে নিয়ে যাওয়ার কথা জানতে চাইলে বলেন, অফিসের কোন কাজ আটকে গেলে তখন আমাকে ডাকা হয় তখন আসি। কাজের বিনিময়ে কোনদিন ২৫০ টাকা কোনদিন ৩০০ টাকা দেয়।
বিনোদনগর ইউনিয়ন সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) মরিয়ম আক্তার বলেন, আমার অফিসে চারজন স্টাফ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আমরা দুইজন আছি। বাহিরে সঞ্জিত নামের ব্যক্তি কর্মকর্তা আসার আগেই অফিসে আসেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লোকবল সংকটের কারণে কাজের চাপ সামলাতে তাকে দিয়ে কিছু কাজ করানো হয়। তবে তিনি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। তার কথা বলা যাবে না।
এদিকে উপজেলা সূত্রে জানা যায়, উপজেলা ভূমি অফিসের শূন্যপদ- সার্ভেয়ার ১জন, প্রসেস সার্ভার ১জন, ক্রেডিট চেকিং ১জন, সার্টিফিকেট পেশকার ১জন, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী ৩জন, ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী ৬ জন, অফিস সহায়ক ১৪ জন।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাজিদ উল মাহমুদ বলেন, এবিষয়ে এখনো কোন অভিযোগ পায়নি তবে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
এদিকে সচেতন মহল বলছেন, অভিযোগ হলে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ভূমি কর্মকর্তা। কিন্তু তারা অফিসগুলো পরিদর্শন করে দেখেও না কি অবস্থায় চলছে। তাই তাদের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেন বিষয়গুলো বিবেচনা করে সাধারণ মানুষকে দালালদের বিড়ম্বনা থেকে বাঁচায়।
