×

আক্কেলপুরে তুলসীগঙ্গায় নেই আগের মত স্রোত, কমেছে দেশি মাছ

আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার কাঁচাবাজার ঘেঁষে এঁকেবেঁকে বয়ে যেত তুলসীগঙ্গা নদী। ছিল তীব্র স্রোত, ছিল ঢেউ। নদীর পানিতে বিচরণ করত দেশি প্রজাতির নানা মাছ। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল স্থানীয় জেলেদের জীবন-জীবিকা।
একসময় তুলসীগঙ্গায় জাল ফেললেই মিলত শোল, বোয়াল, টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, পুঁটি, মলা, খলিশা, চাঁদা, বেলে, চিংড়ি ও গুচি বাইনসহ নানা প্রজাতির মাছ। এসব মাছ শুধু আক্কেলপুরের স্থানীয় বাজারেই নয়, আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারেও বিক্রি হতো। মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে নদীপাড়ের বহু পরিবারের সংসার চলত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। একসময়ের স্রোতস্বিনী তুলসীগঙ্গা এখন অনেকটাই স্থবির। কোথাও অল্প পানি, কোথাও কাদা, আবার কোথাও জমেছে ময়লা-আবর্জনা। নেই আগের মতো স্রোত, নেই ঢেউয়ের সেই চেনা ছন্দ। মাছের প্রাচুর্যও যেন এখন অতীতের গল্প।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীতে পানি কমে যাওয়া, নাব্যতা সংকট, পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে গেছে। কোথাও কোথাও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মাছের বিচরণ ও প্রজননের পরিবেশও সংকুচিত হয়েছে।
স্থানীয় জেলে লজিন হোসেন বলেন,আগে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ কেজি মাছ পাওয়া যেত। কোনো দিন ৫ হাজার টাকা, আবার কোনো দিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতো। এখন ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মাছ পেতেই হিমশিম খেতে হয়।
প্রবীণ বাসিন্দা লারান হাওলাদার বলেন, আগে নদীতে তীব্র স্রোত ছিল। দিনে-রাতে শত শত মাছ ধরার নৌকা নদীতে জমা হতো। এখন সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দা আলতাব হোসেন বলেন, আগে নদী ছিল এলাকার মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। এখন নদীর অবস্থা দেখে মনে হয়, ধীরে ধীরে এর প্রাণটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
মাছ ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম বলেন,আগে একজন জেলে ৩০ থেকে ৪০ কেজি মাছ নিয়ে বাজারে আসতেন। এখন পুরো বাজারে নদী থেকে ৫ থেকে ১০ কেজি মাছ আসাটাই ভাগ্যের ব্যাপার। বাজারের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মাছ সংগ্রহ করতে হয়।
জেলেদের জীবন-জীবিকায়ও পড়েছে এর সরাসরি প্রভাব। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় অনেক জেলে আগের পেশা ছেড়ে কৃষিকাজ, দিনমজুরি কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। যারা এখনও মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তাদের অনেকেই আগের মতো আয় করতে পারছেন না।
স্থানীয় জেলে জনি হোসেন বলেন, উপজেলা মৎস্য অফিসে মিটিং হলে আমাদের বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে ডাকা হয়। উপজেলায় শত শত জেলের জেলে কার্ড আছে। কিন্তু আমরা তেমন কোনো সহায়তা পাই না।
শুধু মাছ ও জেলেদের জীবন-জীবিকাই নয়, তুলসীগঙ্গার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় মানুষের স্মৃতিও যেন হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় যে নদীতে ছিল স্রোত, নৌকা চলাচল ও মাছের বিচরণ, সেই নদীর অনেক অংশ এখন অগভীর হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও দেখে মনে হয়, এটি যেন নদী নয়—একটি মরা খাল কিংবা ডোবা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তুলসীগঙ্গার নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় স্থানে পুনঃখনন করতে হবে। একই সঙ্গে নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ, দখল ও ভরাট ঠেকানো, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষতিকর ও অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত নজরদারিরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলেদের অভিযোগ, শুধু জেলে কার্ড দেওয়াই যথেষ্ট নয়; নদীনির্ভর এসব পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নদীটি পুনরুদ্ধার করা গেলে একদিকে যেমন ফিরতে পারে দেশি মাছের প্রাচুর্য, অন্যদিকে আবারও স্বাবলম্বী হতে পারেন নদীনির্ভর জেলেরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে তুলসীগঙ্গা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিলে নদীটি ফিরে পেতে পারে তার হারানো প্রাণ। ফিরতে পারে স্রোত, ফিরতে পারে মাছ, আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে নদীর ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবার।
তুলসীগঙ্গার বুকজুড়ে এখন যেন একটাই প্রশ্ন- ফিরবে কি সেই স্রোত, ফিরবে কি হারিয়ে যাওয়া দেশি মাছ আর নদীর প্রাণ।