

নিজস্ব প্রতিবেদক
সাধারণত বর্ষা মৌসুমে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। এসময় সাপের আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় সাপ উঁচু জমিতে, বাড়ির আনাচে-কানাচে, ঝোঁপঝাঁড়ে অবস্থান করে; কিন্ত এ সাপ নিয়ে মানুষের ধারণা ও ভীতি এবার অন্যরকম। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিষাক্ত রাসেল ভাইপার (চন্দ্র বোড়া, উলু বোড়া) সাপ দেখা দেওয়ায়, বর্তমানে আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই রাসেল ভাইপার। এ নিয়ে দিনাজপুরের সর্বত্রই জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন ধরনের প্রচারণায় এ আতঙ্কের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আশারা কথা এ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দিনাজপুর জেলা সিভিল সার্জন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর জেলার ১৩ উপজেলায় গতকাল সোমবার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৬৬ ভায়াল অ্যান্টিভেনাম মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে জেলার ১৩ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১৬টি, এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৫০০টি, সদর হাসপাতালে ৫০টি ভায়াল অ্যান্টিভেনাম মজুদ রয়েছে। সূত্রটি মতে গতকাল সোমবার আরও ৫০০টি অ্যান্টিভেনামের চাহিদা দেয়া হয়েছে, এর মধ্যে সোমবার আরও ২০ ভায়াল অ্যান্টিভেনাম সরবরাহ পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন সূত্র ও তথ্যে জানা যায়, দেশের সবচেয়ে বিষধর সাপ রাসেল ভাইপার। যা দেশে একটা সময় চন্দ্র বোড়া, উলু বোড়া নামেই পরিচিত ছিল। একসময় দেশ থেকে বিলুপ্ত হলেও নতুন ভাবে দেখা দিয়েছে এই সাপ। এই সাপ সাধারণত নিচু ভূমির ঘাসবন, ঝোপজঙ্গল, উন্মুক্ত বন, কৃষি এলাকায় থাকতে পছন্দ করে এবং মানুষের বসতি এড়িয়ে চলে। সাপটি মেটে রঙের হওয়ায় মাটির সাথে সহজে মিশে যেতে পারে। রাসেল ভাইপার দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় নদীর স্রোতে ও বন্যার পানিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হতে পারে। এই সাপের বিশেষত্ব হচ্ছে, এর দ্রুত বংশবিস্তার ক্ষমতা রয়েছে। এরা অন্যান্য সাপের মত ডিম পাড়েনা। এরা সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে। একটি পূর্ণ বয়স্ক সাপ ৩০-৮০টি পর্যন্ত বাচ্চা দিতে পারে। এরা অন্য সাপের মত মানুষ দেখলে পালিয়ে যায় না বরং চুপচাপ থাকে এবং কাছে এলে কামড় বসিয়ে দেয়। এদের বিষ এতটাই মারাত্মক যে, কামড় দেয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে অ্যান্টিভেনম না নিলে মৃত্যু নিশ্চিত। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
এদিকে জেলার সর্বত্রই এখন এই রাসেল ভাইপারের আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর থেকে ফুলবাড়ী উপজেলাও পিছিয়ে নয়। উপজেলায় এই বিষধর রাসেল ভাইপার সাপের দেখা না মিললেও আতঙ্কিত রয়েছে সাধারণ মানুষ। আশার কথা হচ্ছে, ফুলবাড়ীতে বিষধর রাসেল ভাইপার সাপের এন্টিভেনম পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, তাই অহেতুক আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মশিউর রহমান।
তিনি বলেন, ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাসেল ভাইপারসহ চারটি বিষধর সাপের জন্য ১৮ ভায়াল অ্যান্টিভেনম মজুদ রয়েছে। যে কোন সাপে কামড় দিলে যতটা দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। কামড় দেয়ার প্রথম কয়েক ঘন্টা রোগীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এ সময় ওঁঝা বা কবিরাজের কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করা যাবেনা। ওই সময় রোগীদের হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রেখে প্রয়োজন মত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। তিনি আরও বলেন, এন্টিভেনম সাধারণ কোন ভ্যাক্সিনের মত নয়। এটি প্রয়োগ করার আগে সাপটি কতটা বিষধর, আদৌ বিষধর কিনা তা নিশ্চিত হতে হয়। এজন্য সাপে কাটা রোগীকে পর্যবেক্ষণে রেখে প্রয়োজন মত এন্টিভেনম দিতে হয়।
সিভিল সার্জন ডা. এ এইচ এম বোরহান উল ইসলাম সিদ্দিকী জানান, রাসেল ভাইপার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া কিছুই নেই। রাসেল ভাইপারের বিস্তৃত সাধারণত বন্যা প্রবণ এলাকায়। এরা জলে স্বাভাবিক চলাচলা করতে পারে এবং কচুরিপানার উপর ভর করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে। এদের বিরক্ত না করলে এরা সাধারণত দংশন করে না। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, রাসেল ভাইপারের জন্য জেলার ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ জেলা সদর হাসপাতাল ও এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যথেষ্ট পরিমাণ অ্যান্টিভেনাম মজুদ রয়েছে। বর্তমানে জেলায় ৭৬৬ ভায়াল অ্যান্টিভেনাম মজুদ রয়েছে। এছাড়া সোমবার আবারও নতুন করে ৫০০ ভায়াল অ্যান্টিভেনামের চাহিদা প্রেরণ করা হয়েছে। আতঙ্কগ্রস্থ হওয়ার কোন কারণ নেই।
