

নিজস্ব প্রতিবেদক
নাপিতের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার বিরক্তি থেকে জেদে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কাঁচি ও চিরুনি। প্রথমবার ছোট ভাইয়ের চুল কেটে কাঁদিয়েছিলেন, পরে সেই ভুল থেকেই শিখেছেন চুল কাটার কৌশল। এরপর ১৭ বছর ধরে আয়নার সামনে, কখনো না দেখেই নিজের চুল নিজেই কেটে চলেছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বাসিন্দা মুজাহিদুল ইসলাম।
হাফেজিয়া মাদরাসার ছাত্র মুজাহিদুল ইসলামের সাপ্তাহিক একমাত্র ছুটির দিন শুক্রবার। সপ্তাহজুড়ে মাদরাসার নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকারপর এই একটি দিনের জন্যই ছিল তার নানা পরিকল্পনা। কিন্তু সেই দিনটির বড় একটি অংশ কেটে যেত নাপিতের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চুল কাটার অপেক্ষায়।
চুল কাটাতে হলে আগে সিরিয়াল। আর সিরিয়াল পেতে হলে অপেক্ষা। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলত না সুযোগ।
একদিন সেই অপেক্ষা থেকেই জন্ম নেয় জেদ। আর সেই জেদই ধীরে ধীরে বদলে দেয় অভ্যাস। বাজার থেকে একটি কাঁচি ও চিরুনি কিনে শুরু হয় নিজের চুল নিজেই কাটার চেষ্টা। সেই শুরু থেকে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৭ বছর। আজও নাপিতের দোকানে না গিয়ে নিজের চুল নিজেই কাটেন মুজাহিদুল ইসলাম।
মুজাহিদুল ইসলাম ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ বাসুদেবপুর (পুরাতন বন্দর) গ্রামের বাসিন্দা। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় দাওয়া সম্পাদক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল, বর্তমানে পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর উপজেলার ভবানীপুর ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায় প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। এক সন্তানের জনক এই শিক্ষক এখন নিজের প্রয়োজনমতো, নিজের পছন্দে নিজেই চুল কেটে নেন।

মুজাহিদুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি ২০০৬ সালের দিকের। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় তখন একজন নাপিত ছিলেন। তিনি খুব সুন্দর করে চুল কাটতেন। ফলে তার দোকানে সব সময় ভিড় লেগেই থাকত। আমি তখন হাফেজিয়া মাদরাসায় পড়ি। সপ্তাহে শুধু শুক্রবার ছুটি পেতাম। সেই একদিনের ছুটিও যদি চুল কাটার অপেক্ষায় নষ্ট হয়ে যায়, তখন বিষয়টি খুব খারাপ লাগত। এক শুক্রবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সিরিয়াল পাইনি। পরের সপ্তাহে আবারও যাই সেই দোকানে। সেদিন তার আগে আরও তিনজন অপেক্ষায় ছিলেন। ক্ষুধা লাগায় ভাবলাম, বাড়ি থেকে খেয়ে এসে আবার দোকানে ফিরব। কিন্তু ফিরে এসে দেখি, আমার সিরিয়াল চলে গেছে। অনেক অনুরোধ করেও সেদিন নাপিতকে রাজি করাতে পারিনি। তখন আমার ভেতরে জেদ চেপে বসে। ভাবলাম, অন্যের কাছে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে নিজেই যদি শিখে ফেলি! সেদিন আমি নাপিতের হাতের দিকে খুব খেয়াল করছিলাম। কীভাবে তিনি কাঁচি ধরেন, কীভাবে চিরুনি ব্যবহার করেন।
এরপর বাজার থেকে কিনে ফেলেন একটি কাঁচি ও চিরুনি। বাড়িতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শুরু হয় অনুশীলন। কিন্তু নিজের চুলে পরীক্ষা করে খুব একটা সুবিধা হচ্ছিল না। তখন দরকার হলো একজন ‘মডেল’। মাদরাসার এক ছোট ভাইকে তিনি বুঝিয়ে বললেন, তাকে সুন্দর করে চুল কেটে দেবেন। কিন্তু ফল হলো উল্টো।
মুজাহিদুল হাসতে হাসতে সেই দিনের কথা স্মরণ করেন, মাদরাসার সেই ছোট ভাইয়ের চুল কাটার পর অবস্থা এমন হলো যে সে আয়নায় নিজেকে দেখে কান্না শুরু করে দিল! ছেলেটিকে সান্ত্বনা দিতে শেষ পর্যন্ত দোকান থেকে কিছু খাবার কিনে দেই। এরপর একটি ব্লেড কিনে মাথা ন্যাড়া করে দিতে হয়। সেই ব্যর্থতাই অবশ্য থামাতে পারেনি। বরং ভুল থেকে শিখতে শুরু করি।
পরে মাদরাসার সহপাঠী ও ছোটদের চুল কাটতে শুরু করেন মুজাহিদুল। ধীরে ধীরে কাঁচি ও চিরুনির ব্যবহারও আয়ত্তে চলে আসে।

তিনি বলেন, আমাদের মাদরাসাটি বড় ছিল। শুক্রবার অনেক ছাত্রের চুল কেটে দিতাম। এভাবে বারবার করতে করতেই চুল কাটার কৌশলটা শিখে ফেলি। একদিন তার চুল কাটার কাজ দেখে একজন শিক্ষকও প্রশংসা করেন। শিক্ষক তাকে বলেন, এত সুন্দর করে চুল কাটতে পারলে এর জন্য কিছু টাকা নেওয়া যেতে পারে।
শুরু হলো নতুন অধ্যায়। প্রথমে তিন টাকা করে চুল কাটতেন। সপ্তাহের শেষে সেই টাকা তুলে বন্ধুদের নিয়ে নাস্তা করতেন। পরে চাহিদা বাড়তে থাকলে তিন টাকা থেকে পাঁচ, তারপর সাত টাকা নিতেন। একে একে গ্রামের ছেলেরাও বাড়িতে এসে চুল কাটার বায়না ধরে। গ্রামের মানিক, রেজা, রাতুল, ফরহাদ, সঞ্জিত, সোহাগ, জয় বলেন, মুজাহিদ ভাই ছুটিতে বাড়িতে স্যালুনের মতো চেয়ারে বসিয়ে আমাদের চুল কেটে দিয়েছেন। ঠিক নাপিতের মতোই তিনি চুল কেটে দিতেন।
একসময় তিনি ভাবলেন, অন্যের চুল কাটতে পারলে নিজের চুলের জন্যই বা অন্যের কাছে যেতে হবে কেন? এরপর নিজের চুল নিজেই কাটার অনুশীলনে আরও মনোযোগী হন মুজাহিদুল। শুরুতে সব সময় ফল ভালো হতো না। তবে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি হয়। কোন অংশে কতটা চুল কাটতে হবে, কোথায় কাঁচি চালাতে হবে, সবই আন্দাজে আয়ত্তে চলে আসে।
তিনি বলেন, প্রথম দিকে আয়নার সামনে অনেক চেষ্টা করেছি। পরে অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন খুব দ্রুত নিজের চুল কাটতে পারি। অনেক সময় আয়নায় খুব বেশি না দেখেও প্রায় নিখুঁতভাবে চুল কেটে ফেলতে পারি। গত ১৭ বছরে এই অভ্যাস আর বদলায়নি। চুল বড় হলেই আয়না, কাঁচি আর চিরুনি নিয়ে বসে পড়েন তিনি। নেই কোনো সিরিয়াল, নেই অপেক্ষা, নেই সময়ের অপচয়।
নিজের চুল নিজেই কাটার আরেকটি কারণ উল্লেখ করে বলেন, বিগত হাসিনা সরকারের সময় শিবির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চলতো। যাকে যেখানে পেত তুলে নিয়ে যেত। আমি পর্যায়ক্রমে শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকায় আমাদের উপর সবসময় ছাত্রলীগ বা পুলিশের টার্গেট থাকতো। এমন প্রেক্ষাপটে স্যালুনের দোকানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করাটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। তাই নিজের রপ্ত করা কৌশলকে কাজে লাগাতাম। এভাবেই অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তার মতে, এতে সময় বাঁচে এবং নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না। নিজের কাজ নিজে করি।
নাপিতের দোকানে একদিনের অপেক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া এক কিশোরের জেদ আজ ১৭ বছরের অভ্যাস। প্রথম পরীক্ষার ব্যর্থতা, এক ছোট ভাইয়ের কান্না, মাদরাসার শিক্ষার্থীদের চুল কাটা, বন্ধুদের নিয়ে নাস্তা, তারপর নিজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠা।
মুজাহিদুল ইসলামের গল্প তাই শুধু নিজের চুল নিজে কাটার গল্প নয়। এটি একটি জেদকে দক্ষতায় পরিণত করার গল্পও।
