×

নন্দীগ্রামে আগাম আমন ধানের ভালো ফলনে কৃষকের মুখে হাসি

নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধি
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় আগাম জাতের রোপা আমন ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। মাঠজুড়ে এখন পাকা ধানের সোনালি আভা। কোথাও কৃষক ধান কাটছেন, কোথাও চলছে মাড়াই, আবার কোথাও কাটা ধান বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি। অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাইয়ের তুলনামূলক কম প্রকোপে আগাম জাতের আমন ধানের ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্বস্তি ও আশার আলো।
ধান ঘরে তোলার পর একই জমিতে আলু, সরিষা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন রবি ফসল চাষ করে বাড়তি আয় করার পরিকল্পনা করছেন তারা। আগাম জাতের আমন ধান চাষের অন্যতম সুবিধা হলো কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায়। এতে একদিকে যেমন ধান বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়া যায়, অন্যদিকে দ্রুত জমি প্রস্তুত করে পরবর্তী ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার রিধইল, কৈগাড়ী, নামুইট, বাদলাষনসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠ ঘুরে দেখা যায়, আগাম জাতের আমন ধান পাকতে শুরু করেছে এবং অনেক জমিতে ইতোমধ্যে কাটা-মাড়াই চলছে। সোনালি ধানে ভরে উঠেছে বিস্তীর্ণ মাঠ। কৃষক, কৃষিশ্রমিক ও পরিবারের সদস্যরা ধান কাটা, আঁটি বাঁধা, মাড়াই এবং শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কৃষকেরা জানান, আগাম জাতের ধান চাষ করলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়। এরপর জমিতে আলু, সরিষা, পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা যায়। এতে জমি দীর্ঘ সময় খালি পড়ে থাকে না এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যেসব কৃষক একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলাতে চান, তাদের কাছে আগাম জাতের আমন ধান দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি রোপা আমন মৌসুমে নন্দীগ্রাম উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় মোট ১৯ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯১৭ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। আগাম জাতের এসব ধানের মধ্যে রয়েছে বিনা-৭, বিনা-১৭, মিনিকেট, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৯০, ব্রি ধান-৭৫, রঞ্জিত ও কাটারিভোগ। এসব জাতের ধান ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া আগাম জাতের ধান কাটা-মাড়াই শেষ হলে পর্যায়ক্রমে ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৫১, ব্রি ধান-১০৩ ও স্বর্ণা-৫ জাতের ধান কাটার কাজ শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উপজেলার বাদলাষন গ্রামের কৃষক জামিল হোসেন বলেন, আগাম পাঁচ বিঘা জমিতে ব্রি ধান-৪৯ জাতের ধান চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। এখন ধান কাটা শেষ করে জমি প্রস্তুত করে সরিষা চাষ করব।
শুধু জামিল হোসেনই নন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক কৃষক আগাম আমন ধান কাটার পর আলু, সরিষা ও পেঁয়াজ চাষের পরিকল্পনা করছেন। কৃষকদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী ফসল উৎপাদন করতে পারলে চলতি মৌসুমে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে।
আমন ধান কাটার পর নন্দীগ্রামে রবি ফসল চাষের ব্যস্ততা শুরু হবে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া ৫ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা, ১০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা এবং ৩০ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
কৃষি বিভাগের এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হলে আমন ধানের পাশাপাশি রবি ফসল উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে নন্দীগ্রামের কৃষকেরা। বিশেষ করে আগাম ধান কাটার পর দ্রুত জমি প্রস্তুত করতে পারলে আলু ও সরিষা চাষের উপযুক্ত সময় কাজে লাগানো সহজ হবে।
তবে কৃষকদের প্রত্যাশিত লাভ অনেকাংশে নির্ভর করবে বীজ, সার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য উৎপাদন খরচের ওপর। পাশাপাশি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একদিকে ঘরে তোলা হচ্ছে সোনালি ধান, অন্যদিকে চলছে পরবর্তী ফসল চাষের প্রস্তুতি। আগাম ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচের অর্থ সংগ্রহ এবং একই জমিতে নতুন ফসল ফলানোর মাধ্যমে বাড়তি লাভের আশা করছেন কৃষকেরা।
কৃষক জয়নাল আবেদীন জানান, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেলে লাভের পরিমাণ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে আলু, সরিষা ও পেঁয়াজের ভালো ফলন এবং বাজারে উপযুক্ত দাম পাওয়া গেলে চলতি মৌসুমে তারা লাভবান হতে পারবেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গাজিউল হক বলেন, আমরা কৃষকদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছি। সার, বীজ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার ফলে এ বছর রোগবালাইয়ের প্রকোপ প্রায় ছিল না বললেই চলে। ফলনও ভালো হয়েছে।
কৃষকদের সঠিক সময়ে জমি প্রস্তুত, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, সার প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। নন্দীগ্রামে আগাম আমন ধান কাটার মধ্য দিয়ে কৃষকদের ব্যস্ততা এখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।