বৃহস্পতিবার, ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বীরগঞ্জে ঢেপা নদীর চরে সবুজের বিপ্লব

বীরগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ঢেপা নদী যেন ঋতুর পালাবদলের সঙ্গে নিজের রূপ বদলায়। বর্ষায় যে নদী ছিল স্রোতস্বিনী, শুষ্ক মৌসুমে তার বুকেই জন্ম নেয় বিস্তীর্ণ চর। আর সেই চরজমি এখন শুধু বালুর স্তূপ নয় এখানেই গড়ে উঠছে সম্ভাবনার সবুজ রাজ্য, যেখানে প্রতিটি ধানের চারা যেন সংগ্রাম ও স্বপ্নের প্রতীক।
শীত নামার সঙ্গে সঙ্গে নদীর পানি ধীরে ধীরে সরে যায়। উন্মুক্ত হয়ে পড়ে নদীর তলদেশ। এই সময়টিই হয়ে ওঠে স্থানীয় ভূমিহীন মানুষের জন্য আশার মৌসুম। জমি না থাকলেও থেমে থাকেন না তারা। নদীর বুকের এই অস্থায়ী জমিকেই তারা নিজেদের করে নেন, শ্রম আর মেধা দিয়ে গড়ে তোলেন চাষের উপযোগী ক্ষেত।
নভেম্বর থেকে শুরু হয় তাদের প্রস্তুতি। মাটি কেটে সমান করা, আইল তুলে পানি আটকে রাখা সবকিছুই চলে হাতে কলমে পরিশ্রমের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে বালুর চর বদলে যায় উর্বর জমিতে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সেখানে রোপণ করা হয় বোরো ধানের চারা। নদীর স্বল্প পানি সেচের কাজ করে, ফলে অতিরিক্ত খরচের প্রয়োজন হয় না। প্রকৃতির এই সহায়তাই চাষিদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
চরের কৃষিকাজের সবচেয়ে বড় সুবিধা এর কম ব্যয়। সমতল জমিতে যেখানে এক বিঘা বোরো চাষে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়, সেখানে নদীর চরে সেই ব্যয় নেমে আসে অনেক কমে। সেচ, সার ও শ্রমের খরচ কম থাকায় এই চাষ পদ্ধতি হয়ে উঠেছে সাশ্রয়ী ও লাভজনক। ফলনও আশানুরূপ প্রতি বিঘায় পাওয়া যায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান, যা দিয়ে একটি পরিবারের কয়েক মাসের খাদ্যচাহিদা সহজেই মেটানো সম্ভব।
এই চাষাবাদ শুধু অর্থনৈতিক হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনের গভীর বাস্তবতা। যারা নিজের জমির অভাবে দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজ থেকে দূরে ছিলেন, তারা এখন নতুন করে ফিরে পেয়েছেন আত্মনির্ভরতার পথ। নদীর চরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি ধানগাছ তাদের কাছে কেবল ফসল নয়, বরং টিকে থাকার অবলম্বন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগও এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। আগে যে চরগুলো অনাবাদি পড়ে থাকত, এখন সেগুলো উৎপাদনের আওতায় আসায় সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও এটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ঢেপা নদীর চরে দাঁড়ালে চোখে পড়ে এক অপূর্ব দৃশ্য বালুর বুক চিরে দুলছে সবুজ ধানক্ষেত। প্রকৃতি আর মানুষের মিলিত প্রয়াসে তৈরি হয়েছে এই নতুন বাস্তবতা। এখানে প্রতিটি শস্যদানা শুধু খাদ্য নয়, এটি সংগ্রামের জয়গান, এটি নতুন করে বাঁচার গল্প।
বীরগঞ্জের এই চরাঞ্চল আজ প্রমাণ করছে, সীমাবদ্ধতা যতই থাকুক, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকেই সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব। নদীর বুকে গড়ে ওঠা এই সবুজ বিপ্লব নিঃসন্দেহে গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য উদাহরণ।
বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে জমিতে দীর্ঘ সময় ঢেপা নদীতে বন্যার পানি থাকায় বোরোধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করছেন। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image
Share This

COMMENTS